এআই যেভাবে ইরান যুদ্ধে প্রভাব ফেলছে—কোন পথে আগামীর সমরকৌশল?
সমরক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারকে নতুন করে আতশকাচের তলায় নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর ঠিক আগের দিনই নিজেদের এক প্রধান এআই সরবরাহকারী সংস্থাকে সরিয়ে দেয় ওয়াশিংটন। এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নৈতিক মতবিরোধের জেরেই এই পদক্ষেপ।
এদিকে যুদ্ধে এআইয়ের আইনি ও নৈতিক ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যে পৌঁছতে এ সপ্তাহেই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠকে বসেন একদল শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ। দীর্ঘদিন ধরেই স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র ও সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তির চেষ্টা চলছে। এই বৈঠক তারই অংশ।
ফিলাডেলফিয়ার ইউনিভার্সিটি অভ পেনসিলভেনিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল হরোউইটজ-এর মতে, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না আন্তর্জাতিক স্তরের শ্লথ আলোচনা।
যুক্তরাজ্যের নিউকাসল ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্রেইগ জোনস সামরিক লক্ষ্যভেদ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, 'যুদ্ধের ময়দানে এআইকে নিয়ম-নীতির আওতায় আনার চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ। যুদ্ধে এর ব্যবহার বন্ধ রাখা বা আইনি গণ্ডিতে বাঁধার বিষয়ে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় এই মারণ-প্রযুক্তির প্রসার এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।'
রণক্ষেত্রে এআই
রণক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে কাজ করছে এই প্রযুক্তি? হরোউইটজ বলেন, মার্কিন বাহিনী মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল-নির্ভর (এলএলএম) এআই ব্যবহার করছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও রণক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে।
উদাহরণস্বরূপ ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেমের কথা বলা যায়। এই ব্যবস্থাটি ছবি বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত দ্রুত শত্রুশিবিরের লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে পারে। ওয়াশিংটন পোস্টসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরানের সাম্প্রতিক হামলাসহ আগের অনেক আক্রমণেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে। তবে 'এর খুঁটিনাটি এখনও জনসমক্ষে আসেনি' বলে জানান হরোউইটজ।
অনেকে মনে করেন, নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম হওয়ায় যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার বেসামরিক প্রাণহানি কমাবে। যদিও ইউক্রেন বা গাজা যুদ্ধের বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। ড্রোন চালনা থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হলেও সেখানে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার আকাশছোঁয়া।
জোনস বলেন, 'এআই ব্যবহার করলে সাধারণের প্রাণহানি কমে—এমন কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। বরং উল্টোটাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।'
মানুষের প্রত্যক্ষ নজরদারি ছাড়াই লক্ষ্য খুঁজে নিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম ড্রোনের ব্যবহার এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর পার্থক্য করতে পারা যেকোনো মারণাস্ত্রের জন্য বাধ্যতামূলক। হরোউইটজ বলেন, এলএলএম-চালিত এবং মানুষের নজরদারিহীন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বর্তমানে নির্ভরযোগ্য নয় এবং এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
গভীর উদ্বেগ
ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক ও মার্কিন যুদ্ধ দপ্তরের মধ্যে মতবিরোধের মূলে রয়েছে ভবিষ্যতে এআইয়ের সম্ভাব্য ব্যবহার। ২০২৪ সাল থেকে যুদ্ধ দপ্তরের সঙ্গে ২০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় ম্যাভেন সিস্টেমকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে অ্যানথ্রপিকের ক্লড এলএলএম।
গত জানুয়ারিতে ওই দপ্তর একটি নির্দেশিকা জারি করে। সেখানে বলা হয়, সরকারি পর্যায়ে এআই কেনার চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে যে, কোনোরকম বিধিনিষেধ ছাড়াই এই প্রযুক্তি 'যেকোনো বৈধ কাজে' ব্যবহার করা যেতে পারে।
কিন্তু অ্যানথ্রপিক তাদের নিরাপত্তাজনিত শর্তগুলো প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের এআই মডেল ক্লডকে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক নজরদারি বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পরিচালনায় ব্যবহার করা যাবে না। বর্তমান প্রযুক্তি এখনও এসব কাজ নিখুঁতভাবে করার মতো নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি বলে জানায় অ্যানথ্রপিক।
এর জেরে ২৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারি কাজে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দেন। হরোউইটজ বলেন, 'ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে তাত্ত্বিক বিবাদের জেরে পুরো বিষয়টি বড় আকার ধারণ করে।'
অ্যানথ্রপিককে বাদ দেওয়ার পর সান ফ্রান্সিসকোর আরেক এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছে মার্কিন সরকার। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে তাদের প্রযুক্তি কোনো ধরনের নজরদারি বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পরিচালনায় ব্যবহৃত হবে না।
অন্যদিকে ৫ মার্চের খবর অনুযায়ী, অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই ফের মার্কিন যুদ্ধ দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
এআইয়ের সম্ভাব্য নেতিবাচক ও অনৈতিক ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। গুগল ও ওপেনএআইয়ের কর্মীরা এখন একটি পিটিশনে স্বাক্ষর সংগ্রহ করছেন। দেশের ভেতরে ব্যাপক নজরদারি কিংবা মানুষের নজরদারি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষ হত্যার কাজে যাতে প্রতিষ্ঠানের এআই মডেলগুলো ব্যবহৃত না হয়, সেই দাবিতেই ওই দুই কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তারা।
যুদ্ধে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে একটি গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টনি এরস্কিন। গত বছর এই গবেষণার ভিত্তিতে বেশ কিছু নীতিগত সুপারিশও করা হয়।
এলএলএমের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্টতা ও স্বচ্ছতার অভাবের মতো পরিচিত সমস্যাগুলোর পাশাপাশি ওই প্রতিবেদনে একটি বড় বিপদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধির জায়গা এআই দখল করলে তা থেকে ভুলবশত সংঘাত আরও চরমে পৌঁছতে পারে।
ওই রিপোর্টে বলা হয়, মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা নৈতিকভাবে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। পাশাপাশি এতে আরও জানানো হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় নয় এমন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। তাই তারও সঠিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
আইনি সমাধানের খোঁজ
যুদ্ধে এআইয়ের আইনি ও নৈতিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে পৌঁছনোর একাধিক উচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা চলছে। কিন্তু মূল পক্ষগুলোর সদিচ্ছার অভাবেই সেই প্রয়াস বারবার হোঁচট খাচ্ছে বলে মনে করেন জোনস। তিনি বলেন, 'আমেরিকা, ইসরায়েল ও চীনের মতো যে দেশগুলোর নিজস্ব সক্রিয় এআই যুদ্ধ-কর্মসূচি রয়েছে, তারা সাধারণত এর ওপর আরও নতুন করে নিয়ন্ত্রণ চাপানোর বিরোধী।'
কনভেনশন অন সার্টেইন কনভেনশনাল ওয়েপনস-এর (সিসিডব্লিউ) মাধ্যমেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম উঠে আসতে পারে।
চলতি সপ্তাহে জেনেভায় প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা-সংক্রান্ত সিসিডব্লিউয়ের বিশেষজ্ঞ দলের একটি বৈঠক বসে। সেখানে সামরিক এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার প্রসঙ্গে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
গত মাসে প্রকাশিত ওই রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়েছিল, প্রযুক্তির জন্য চুক্তি করার পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুদ্ধ দপ্তর বর্তমানে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এই পর্যায়েই রয়েছে। তাই এই সময়েই 'দায়িত্বশীল আচরণের নীতিগুলো' স্পষ্ট করে নেওয়া উচিত।
ক্যালিফর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন-এর সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হার্বার্ট লিনের মতে, এই সমস্ত প্রয়াসই একটি বড় বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। তা হলো, এআই-চালিত সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী ব্যবস্থার সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা অথবা এআইয়ের ব্যবহারের সীমারেখা টানা। কারণ এআই এখন বহু কম্পিউটার ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
লিন বলেন, 'বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।' তার মতে, যুদ্ধে এআইয়ের বৈধ ব্যবহার নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছনোর ধারেকাছেও এখনও যেতে পারেনি বিশ্ব।
