এআই ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজ হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় লক্ষ্য
গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কতটা মূল্যবান—তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে কে প্রশ্নটি করছেন এবং কখন করছেন তার ওপর।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার আগ্রহের কথা তুলেছেন। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মালিকানা থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেসব সুবিধা পাবে এবং সেখানে বিদ্যমান আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য বহু খনিজ—নতুন করে ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য হিলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ "জাতীয় নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ এবং আরও অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িত।" তবে গত ডিসেম্বর ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য, খনিজের জন্য নয়।"
এই মতপার্থক্য সত্ত্বেও যে বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত, তা হলো গ্রিনল্যান্ডে এখনো অনাবিষ্কৃত বিরল খনিজ উপাদানের বড় ভাণ্ডার রয়েছে। তবে এসব খনিজের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং সেগুলো উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিনিয়োগ করা আদৌ সার্থক হবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
খনিজ অনুসন্ধান বিশেষজ্ঞ ও ডুরিন মাইনিং টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা টেড ফেল্ডম্যান বলেন, "রাশিয়া ও চীনের মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানো একটি দারুণ ধারণা।" তবে শুধুমাত্র খনিজের জন্য গ্রিনল্যান্ডকে অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন তিনি।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ৬০টি খনিজকে 'গুরুত্বপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে 'বিরল মৃত্তিকা উপাদান' নামে পরিচিত কিছু খনিজ—যেমন নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম—যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিখাতে ব্যবহৃত চুম্বক ও মোটর তৈরিতে অপরিহার্য। অন্যদিকে, কিছু বিরল খনিজের প্রয়োজন আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবকে চালিত করা সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে।
বিরল খনিজের প্রাপ্যতাকে আজকের বহু উচ্চপ্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ 'চোক পয়েন্ট' হিসেবে দেখা হয়। প্রযুক্তিখাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন বর্তমানে বিরল খনিজ উত্তোলন ও পরিশোধন বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে। বেইজিং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় এই খনিজের প্রবেশাধিকারকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এমতাবস্থায়, গেল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের আইনপ্রণেতারা বিরল খনিজের জন্য ২৫০ কোটি ডলারের একটি কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিল উত্থাপন করেছেন।
অর্থাৎ, আমেরিকার কাছে দিন দিন বিরল খনিজের সহজ প্রাপ্যতা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে আরও জরুরি হয়ে পড়ছে। গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা এর সমাধান করতে পারে বলেই বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে গ্রিনল্যান্ডে সোনা ও লোহা থেকে শুরু করে তামা ও গ্রাফাইট পর্যন্ত নানা মূল্যবান আকরিক ও খনিজের ভাণ্ডার রয়েছে। তবে দ্বীপটির দুর্গমতা, কঠোর আবহাওয়া, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং খনিশিল্পের মূল্যসংবেদনশীলতার কারণে এসব সম্পদের বড় অংশই এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা–ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় কোনো খনি না থাকা অঞ্চল বা দেশের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের মজুত রয়েছে।
ফেল্ডম্যানের মতে, গ্রিনল্যান্ডে খনিজের ঘনত্ব এতটা বেশি নয় যে, দ্বীপটি কিনে নিতে বা খনি উন্নয়নে যে বিনিয়োগ দরকার তা যৌক্তিক হবে। তিনি এনবিসি নিউজকে বলেন, "দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের টানব্রিজ ভাণ্ডারকে বিশ্বের অন্যতম বড় বিরল খনিজ ভাণ্ডার বলা হয়, কিন্তু সেখানে মূল্যবান ধাতুর অনুপাত এতই কম যে সেটি পরিবহন করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে।"
বিরল মৃত্তিকার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডে জার্মেনিয়াম ও গ্যালিয়ামেরও বিপুল মজুত রয়েছে, যা উচ্চপ্রযুক্তি প্রয়োগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি খনিজ।
জার্মেনিয়াম ফাইবার-অপটিক তার তৈরির প্রধান উপাদান, আর গ্যালিয়াম ব্যবহৃত হয় সেমিকন্ডাক্টরে—যা কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার এমনকি কোয়ান্টাম ডিভাইসেও প্রয়োজন। বর্তমানে চীন বিশ্বব্যাপী গ্যালিয়ামের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং জার্মেনিয়ামের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। খনিজ উত্তোলনের পর সেগুলো পরিশোধনের ক্ষেত্রেও চীনের আধিপত্য রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় তারা এই প্রভাবকে কাজে লাগায়।
ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি জ্যাক লিফটন বলেন, "বিশ্বজুড়েই বিরল খনিজ রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হলো সেগুলো পরিশোধন করা।" তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ পরিশোধনে দক্ষতার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন। লিফটনের ভাষায়, "মার্কিন বিরল খনিজ শিল্প-সংশ্লিষ্টরা সংখ্যায় এতই কম যে, প্রতীকী অর্থে একটি বড় বাসের ভেতরই অনায়াসে তাদের সবাইকে ঢোকানো যাবে।"
গ্রিনল্যান্ডে বর্তমানে ১৪০টির বেশি সক্রিয় খনিজ লাইসেন্স রয়েছে, যা খনি স্থাপনের আগে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আজ সেখানে মাত্র দুটি খনি চালু আছে।
এই দুটি খনির একটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আমারক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এলদুর ওলাফসন বলেন, দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে তার কোম্পানির সোনার খনি প্রমাণ করে যে সঠিক পদ্ধতি থাকলে গ্রিনল্যান্ডে খনিশিল্প সম্ভব। কোম্পানিটি ডেনমার্কের, গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের ভূখণ্ড।
ওলাফসন এনবিসি নিউজকে বলেন, "ডেনমার্ক মূলত প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দেশ নয়, ফলে এপর্যন্ত খনিজখাতে পুঁজির সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না, যার কারণে আরও বেশি খনি গড়ে ওঠেনি। খনির জন্য শুধু অর্থ নয়, মানুষও প্রয়োজন। মানুষকে বাস্তবে সেখানে নিতে হয়, সড়ক, সেতু, বন্দরের মতো অবকাঠামো গড়তে হয়।"
এদিকে মেরু অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের আবহাওয়া যেমন বৈরী, তেমনি সেকারণে জনসংখ্যাও খুব কম। পুরো অঞ্চলে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস করে। তবে এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের খনি সম্ভাবনা নিয়ে উৎসাহী ওলাফসন। তিনি বলেন, "মনে রাখা জরুরি, আলাস্কা, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন ও রাশিয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে বড় বড় খনি রয়েছে। এগুলো বিশ্বের সেরা খনিগুলোর মধ্যে পড়ে।" গ্রিনল্যান্ডও আর্কটিক অঞ্চলেই অবস্থিত।
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সবসময় নতুন খনি এলাকা দরকার, অথবা বিরল ধাতু রিইসাইকেল করতে হবে, যাতে আসন্ন বিপ্লব—এআই ও একই ধরনের প্রযুক্তির জন্য—যথেষ্ট সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।"
অবশ্য কোনো খনি চালু হওয়ার পরও খনিজের দামের ওঠানামায় সেটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে—যেমনটা হয়েছিল পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের মারমোরিলিকে ব্ল্যাক অ্যাঞ্জেল সিসা-দস্তা খনির ক্ষেত্রে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চালু থাকা এই খনিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মজুত থাকা সত্ত্বেও— বিশ্ববাজারে দস্তার কম দামের কারণে সেটি আর পুনরায় চালু হয়নি।
মার্কিন বিরল খনিজ শিল্পকে সহায়তা এবং এই মূল্যসংবেদনশীলতা মোকাবিলায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর গত জুলাইয়ে দেশটির খনি কোম্পানি এমপি ম্যাটেরিয়ালসের সঙ্গে একটি ব্যতিক্রমী ১০ বছর মেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব চুক্তি করে। এর লক্ষ্য হলো কলোরাডোর একটি রেয়ার আর্থ খনি উন্নয়নের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ শৃঙ্খল জোরদার করা এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো।
পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ভেনেজুয়েলাও 'গুরুত্বপূর্ণ খনিজ'-এর অজুহাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের আলোচনার বাইরে থাকেনি। গত সপ্তাহে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক বলেন, ভেনেজুয়েলায় "ইস্পাত আছে, খনিজ আছে—সব গুরুত্বপূর্ণ খনিজই আছে। একসময় দেশটির খনিশিল্পের গৌরবময় ইতিহাস ছিল, যা এখন মরচে ধরেছে।"
তবে ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউটের লিফটন এ দাবির বিষয়ে সন্দিহান। তিনি বলেন, "ভেনেজুয়েলায় বিরল খনিজ আছে কি না, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমি কয়েক দশক ধরে এই খাতে আছি—ভেনেজুয়েলাকে কখনো বিরল খনিজ উপাদানের উৎস হিসেবে শুনিনি।"
বরং লিফটনের মতে, ভেনেজুয়েলায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রসঙ্গ তোলা রাজনৈতিক অজ্ঞতারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, "যারা বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানে না, তারাই ভেনেজুয়েলায় বিরল খনিজের কথা বলছে। সত্যি বলতে, এটা হাস্যকর।"
