ইরানে আন্দোলন দমনে কঠিন নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখে মাস্কের স্টারলিংক
ইরানে সরকারবিরোধীদের ওপর চলছে কঠোর দমন-পীড়ন। এর মধ্যেই এক কঠিন নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখে পড়েছে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা 'স্টারলিংক'। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় প্রথম আলোচনায় আসা এই প্রযুক্তিটি এখন ইরানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের বিরুদ্ধে মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
স্টারলিংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্পেস-এক্স এই সপ্তাহে ইরানিদের জন্য তাদের সেবাটি বিনামূল্যে করে দিয়েছে। এর ফলে মাস্কের এই মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি এখন এক ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে। একদিকে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল তুখোড় ইঞ্জিনিয়ার, আর অন্যদিকে ইরানের শক্তিশালী স্যাটেলাইট জ্যামার ও সিগন্যাল জালিয়াতির প্রযুক্তি।
স্পেস-এক্স কীভাবে এই আক্রমণ সামলায়, তার ওপর কড়া নজর রাখছে পুরো বিশ্ব। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনও এই লড়াইয়ের ফলাফল দেখতে মুখিয়ে আছে, কারণ তারা নিজেরাও স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রযুক্তি আনার চেষ্টা করছে। আবার স্পেস-এক্স এই বছরই শেয়ার বাজারে আসার পরিকল্পনা করছে। তাই বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি স্টারলিংকের সক্ষমতা প্রমাণের বড় এক সুযোগ।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা জন প্লাম্ব বলেন, 'মহাকাশ থেকে যোগাযোগের ইতিহাসে আমরা এখন এক অদ্ভুত সময়ে আছি। স্পেস-এক্সই এখন একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা এত বড় পরিসরে সেবা দিচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসকরা মনে করে তারা মানুষের যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারবে। কিন্তু এমন দিন আসছে যখন সেটা আর সম্ভব হবে না।'
স্টারলিংকের মাধ্যমে আসছে আন্দোলনের ভিডিও
গত এক সপ্তাহে ইরানে হাজার হাজার আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তেহরান সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করে দেওয়ায় দমন-পীড়নের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্টারলিংক হয়ে উঠেছে তথ্যের প্রধান উৎস। কারণ ক্যাবল বা মোবাইল টাওয়ারের চেয়ে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট জ্যাম করা অনেক বেশি কঠিন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক রাহা বাহরাইনি বলেন, তারা ইরান থেকে আসা কয়েক ডজন ভিডিও যাচাই করেছেন। এর মধ্যে ইরানি বাহিনীর হাতে মানুষের হতাহত হওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। তারা নিশ্চিত যে এসব ভিডিওর প্রায় সবই পাঠানো হয়েছে স্টারলিংকের মাধ্যমে। তবে ইন্টারনেট সংযোগে কড়াকড়ি থাকায় এখনো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য কাজ করা বেশ কঠিন হচ্ছে।
টার্মিনাল পাচার ও জ্যামিং প্রযুক্তি
ইরানে স্টারলিংক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দেশটিতে কয়েক হাজার টার্মিনাল বা রিসিভার অবৈধভাবে ঢুকেছে। এগুলো দেখতে অনেকটা পিৎজা বক্স বা ল্যাপটপের মতো। একটি মার্কিন অলাভজনক সংস্থা 'হোলিস্টিক রেজিলিয়েন্স' এই টার্মিনালগুলো ইরানিদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে। তারা স্পেস-এক্সের সঙ্গে মিলে ইরানের জ্যামিং প্রচেষ্টাও পর্যবেক্ষণ করছে।
স্টারলিংকের প্রায় ১০ হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘণ্টায় ১৭ হাজার মাইল বেগে ঘুরছে। এই দ্রুতগতির কারণেই একে জ্যাম করা বেশ কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন স্যাটেলাইট জ্যামার এবং 'স্পুফিং' বা ভুয়া জিপিএস সিগন্যাল ব্যবহার করে স্টারলিংক টার্মিনালগুলোকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাইবার বিশেষজ্ঞ নরিম্যান গরিব বলেন, এই জিপিএস জালিয়াতির ফলে ইন্টারনেটের গতি অনেক কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, 'হয়তো মেসেজ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু ভিডিও কল করা যাচ্ছে না।'
টার্মিনাল খুঁজতে মরিয়া ইরান
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহারের কোনো অনুমতি নেই। তবুও ইলন মাস্ক মাঝেমধ্যেই এক্সে (সাবেক টুইটার) দেশটিতে স্টারলিংক সচল থাকার কথা জানান। এতেই চটেছে তেহরান সরকার। ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় মাস্ক জানিয়েছিলেন, ইরানে প্রায় ১০০টি টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দেশটির পার্লামেন্ট স্টারলিংক ব্যবহার বা বিতরণকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি আইন পাস করেছে। শুধু তা-ই নয়, ইরান বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও লড়ছে। তারা জাতিসংঘের টেলিযোগাযোগ সংস্থাকে অনুরোধ করেছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়েকে চাপ দিয়ে এই সেবা বন্ধ করা হয়।
গত নভেম্বরে ইরান জানায়, তারা টার্মিনালগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে এবং সেগুলো অকেজো করতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক একটি হামলার সময় ড্রোনের মধ্যেও স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও স্টারলিংক এখনো একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে টিকে আছে, কিন্তু সামনের দিনগুলোতে এই কারিগরি যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
