নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা: প্রথম ধাপে প্রস্তাব ৩৪,৬০৮ কোটি টাকা
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর অবশেষে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় (পিইসি) প্রকল্পটির প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ–সংক্রান্ত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে পিইসি প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ সময়ের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।
নাম না প্রকাশের শর্তে পাউবোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।
"অন্তবর্তীকালীন সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে চীনসহ বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা হতে পারে," যোগ করেন তিনি।
পাউবোর বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্থান থেকে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি বিভাজন এবং নিম্নপ্রবাহে পানির সুষ্ঠু বণ্টন তুলনামূলকভাবে সহজ হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজের মাধ্যমে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, উজানে গঙ্গা (যেটি বাংলাদেশে পদ্মা) নদীতে ভারতের ফারাক্কা বাধের কারণে বাংলাদেশে পদ্মায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এরকম ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।
প্রকল্পটি নিয়ে জানতে চাইলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার আজিম আহমেদ বিষয়টি পাউবোর মহাপরিচালকের কাছে জানতে বলেন। তবে মন্তব্যের জন্য উক্ত কর্মকর্তাকে তখন পাওয়া যায়নি।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা
১৯৬০-এর দশক থেকেই গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসছে বাংলাদেশ। প্রথম সমীক্ষা শুরু হয় ১৯৬১ সালে তৎকালীন ইপওয়াডা (বর্তমান পাউবো) এর মাধ্যমে।
১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মোট চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়।
এদিকে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলতে থাকে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও ঢাকায় বৈঠক করেন। পরে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি যৌথ কারিগরি উপকমিটিও গঠন করা হয়।
প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট থাকবে, প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার। পাশাপাশি ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট থাকবে। নৌযান চলাচলের জন্য ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস রাখা হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সেতুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
প্রথম পর্যায়ে ব্যারাজের মূল অবকাঠামো নির্মাণসহ হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেম ও গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার (রিভার সিস্টেম) পুনঃখনন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত বা সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং অবশিষ্ট নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, ব্যারাজ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাউড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৪৩.২২ কোটি টাকা। ৪১৮.৬০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে গড়াই অফ-টেক সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে।
গড়াই ও মধুমতী নদী ড্রেজিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। হিসনা নদী সিস্টেমের নিস্কাশন ও পুনঃখনন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। এফ্লাক্স বাধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০৬ কোটি টাকা। চন্দনা ও হিসনা অফ-টেক অবকাঠামো নির্মাণে ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশের নদীগুলোতে ফারাক্কার প্রভাব
প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়। এই চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর এবং তা চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের উজানে পানি প্রবাহের ফলে বাংলাদেশে পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে, কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌচলাচল, গার্হস্থ্য পানির প্রাপ্যতা এবং বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্বাদু পানির প্রবাহ হ্রাসের কারণে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের আশেপাশের নদী এবং খালগুলিতে লবণাক্ততার উচ্চ ঘনত্বের কারণে গুরুতর হমকির সম্মুখীন হয়েছে।
পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী ও চন্দনা-বারাশিয়া নদী ব্যবস্থায় ব্যাপক পলি জমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি সরাসরি বঙ্গোপসাগরে চলে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, পলি জমা, নৌপথ অচল হয়ে পড়া এবং সেচ ও মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনে ব্যাপক হারে 'টপ ডাইং' বা গাছের আগা শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
প্রকল্পের সুফল
পাউবোর এক কর্মকর্তা জানান, বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ করে এই ব্যারাজ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সারা বছর পানির জোগান নিশ্চিত করবে।
শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বোরাল নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে লবণাক্ততা হ্রাস পাবে, স্বাদুপানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো থেকে পলি অপসারণ, পোল্ডারসমূহের নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সেচ সুবিধা বাড়বে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পদ্মা নির্ভর (জিডিএ) দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা এই অঞ্চলে বাস করে। প্রস্তাবিত ব্যারাজ ১৯৯৬ সালের চুক্তির আওতায় প্রাপ্ত পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
সংকটাপন্ন শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজ দিয়ে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিম্নপ্রবাহের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে। গঙ্গা-নির্ভর এলাকা প্রায় ৫১ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর, যা ২৬টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত।
প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রকল্পের অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক ০৫ শতাংশ, এবং বার্ষিক আর্থিক সুফল প্রায় ৭৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি মূলত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যার ফিজিবিলিটি স্টাডি অনেক বছর আগে সম্পন্ন হয়েছিল। তবে বিগত সরকারগুলোর সময়ে বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কিছুক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার সম্ভব। নদীতে নাব্যতা হ্রাস ও পলি জমার সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা কমে যাবে। এছাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৭–৮টি নদীতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
"তবে এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন ব্যারাজের উজানে ক্ষয় ও ভাটিতে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, যা অতীতে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এসব মরফোলজিক্যাল, পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে উন্নত নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে প্রকল্পটির সামগ্রিক সুফল নেতিবাচক প্রভাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে," বলে জানান তিনি।
