ইরানে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে স্টারলিংক সেবা; তবে ব্যবহারকারীদের নিতে হচ্ছে চরম ঝুঁকি
ইরান সরকার গত বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার পর দেশটির ব্যবহারকারীদের জন্য স্টারলিংক তাদের মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি মওকুফ করেছে বলে জানা গেছে। খবর বিবিসি'র।
উল্লেখ্য, বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে ইরান সরকারের এই ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞার ফলে লাখ লাখ ইরানি নাগরিক পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ, জীবিকা নির্বাহ এবং তথ্য পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ভেতরে কী ঘটছে, তা বহির্বিশ্বকে জানানোর ক্ষেত্রে এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে।
বিবিসিকে দুইজন ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, সাবস্ক্রিপশনের অর্থ পরিশোধ না করলেও মঙ্গলবার রাতে তাদের স্টারলিংক সংযোগ সচল ছিল। ইরানিদের ইন্টারনেট ব্যবহারে সহায়তাকারী একটি সংস্থার পরিচালকও নিশ্চিত করেছেন, বর্তমানে স্টারলিংক সেবাটি বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ইরানে অবৈধ হলেও, হাজার হাজার মানুষ এটি ব্যবহার করছেন। সরকারিভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সম্ভবত এটিই শেষ কার্যকর মাধ্যম। এ বিষয়ে বিবিসি স্পেসএক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানে এই সেবা ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। জানা গেছে, মানুষ যেন ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য কর্তৃপক্ষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্টারলিংক ডিশ খুঁজে দেখছে। 'পারসা' (ছদ্মনাম) নামে একজন ব্যবহারকারী স্টারলিংক সংযোগ ব্যবহার করে বিবিসিকে বলেন, 'তারা বিভিন্ন ভবনের ছাদে উঠে আশপাশের ভবনগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে।'
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'মানুষের জানা উচিত, যেসব এলাকা থেকে বেশি ভিডিও ফুটেজ বাইরে যাচ্ছে, সরকার সেসব এলাকাতেই বেশি তল্লাশি চালাচ্ছে। তাই সবাইকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।'
স্টারলিংক ডিভাইসটি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে ভূমিতে স্থাপিত ছোট ডিশের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করে। এটি অনেকটা মোবাইল ফোন টাওয়ারের মতো কাজ করে এবং এতে বিল্ট-ইন ওয়াইফাই রাউটার থাকে। ডিভাইসটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং অনেক ইরানির ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে সেবাটি বিনামূল্যে করে দেওয়ায় এর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার আল জাজিরা টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা এবং বাইরে থেকে নির্দেশ আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।' ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফারস দাবি করেছে, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেন 'সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা' সংগঠিত করা না যায়, সে কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ব্যাপক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথিপত্র সংগ্রহকারীদের কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত একটি মানবাধিকার সংস্থা নিশ্চিত করেছে, বিক্ষোভে ২ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীরও প্রায় ১৫০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দেশের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারায় রক্তপাতের প্রকৃত মাত্রা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মাঠপর্যায়ের ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই করাও অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে। পারসা বলেন, 'আমার মনে হয় অনেকেই ইন্টারনেটে যুক্ত আছেন, কিন্তু তথ্য বাইরে পাঠানোর ঝুঁকি নিচ্ছেন খুব অল্পসংখ্যক মানুষ।'
মানবাধিকার সংস্থা 'উইটনেস'-এর তথ্যমতে, বর্তমানে ইরানে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ স্টারলিংক ব্যবহার করছেন। সংস্থাটির কর্মকর্তা মাহসা আলিমারদানি জানান, ইরানি কর্তৃপক্ষ স্টারলিংক সিগন্যাল জ্যাম করার জোর চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এখন তারা সরাসরি ডিশ বাজেয়াপ্ত করার পথ বেছে নিয়েছে।
তবে যারা এই ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। বিবিসিকে এক ব্যক্তি জানান, নিজের ধারণ করা একটি ভিডিও পাঠাতে তিনি প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়েছিলেন, যাতে প্রতিবেশী দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যায়। তিনি জানান, তেহরানের একটি ফরেনসিক মেডিক্যাল সেন্টারের মেঝেতে অসংখ্য লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য তাকে এতটাই ব্যথিত করেছিল যে, ভিডিওটি শেয়ার করা জরুরি মনে করেছিলেন।
ইরান সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ওপর ডিজিটাল নজরদারির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হ্যাকিং ও ফিশিংয়ের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দেশটিতে ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো পশ্চিমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্লক করা থাকে, ফলে সেগুলো ব্যবহারে ভিপিএনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এত কড়াকড়ির মধ্যেও ইরানে ইনস্টাগ্রামের আনুমানিক ব্যবহারকারী সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য প্রবাহ সীমিত করে ইরান সরকার নিজস্ব বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অক্সফোর্ড ডিজিনফরমেশন অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম ল্যাবের গবেষক আনা ডায়মন্ড বলেন, সরকার তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। হতাহতের ঘটনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় এবং প্রতিরোধের স্পৃহা কমে যায়।
এত ঝুঁকি সত্ত্বেও দেশের ভেতরের খবর বাইরে পৌঁছে দিতে স্টারলিংক অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পারসা বলেন, 'ধরা পড়ার কথা আমি চিন্তাই করতে চাই না। বিষয়টি অত্যন্ত ভীতিকর।'
মঙ্গলবার ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছে, তারা স্টারলিংক কিটের একটি বড় চালান আটক করেছে, যা দেশে 'গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতা' চালানোর উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। তবে বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ সেন্সরশিপ এড়িয়ে যোগাযোগের জন্যই এসব ডিভাইস ব্যবহার করছেন।
পারসা সতর্ক করে বলেন, শুধু ডিভাইসসহ ধরা পড়াই একমাত্র ঝুঁকি নয়। ভিডিও পাঠানোর সময় যদি কেউ নিজের বাড়ি বা ডিভাইস রাখা স্থান থেকেই ভিডিও ধারণ করেন, তাহলে সরকার সেই অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। এতে ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
