ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের; তবুও কীভাবে হামলা চালাচ্ছে তেহরান?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের দাবি সত্ত্বেও তেহরান এখনো প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের আঘাত করার মতো সক্ষমতা বজায় রেখেছে এবং নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউস শনিবার দাবি করেছে, "ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের নৌবাহিনী এখন লড়াই করার সামর্থ্য হারিয়েছে। ইরানের ওপর এখন আমাদের আকাশপথের পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে।" গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' এবং ওয়াশিংটন দাবি করছে এটি ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছে। রবিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন তৈরির সক্ষমতা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
মার্কিন দাবির বিপরীতে সোমবার বিকালেও কাতার ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর জানিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে। এমনকি আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একজন নিহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধের শুরুর তুলনায় বর্তমানে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যেখানে আমিরাতের দিকে ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন ছোড়া হয়েছিল, ১৫তম দিনে এসে তা মাত্র ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬টি ড্রোনে নেমেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।
২০২২ সালের মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ২৫০০-তে নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল কৌশল ছিল ইরানের 'লঞ্চার' বা উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো ধ্বংস করা। ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, তারা ইরানের আনুমানিক ৪১০-৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে ২৯০টি অকেজো করে দিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান বিশাল একটি দেশ এবং সরাসরি স্থল অভিযান ছাড়া তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। তিনি বলেন, "এখন আমরা সেসব ক্ষেপণাস্ত্র দেখছি যা যুদ্ধের আগে গোপন স্থানে বা অসামরিক স্থানে রাখা হয়েছিল, যেখানে নজরদারি কম ছিল।"
ডেস রোচেস মনে করেন, ইরান এখন আর বড় পরিসরে দলবদ্ধ হামলা চালাতে পারছে না। তাই তারা অসামরিক ও বাণিজ্যিক লক্ষ্যবস্তুতে একটি বা দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। একে তিনি 'হ্যারাসমেন্ট ফায়ার' বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার হামলা বলে অভিহিত করেছেন।
ইরান বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, তেহরানের প্রধান হিসাব হলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার আগে যেন ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। ইরান এখন একটি 'ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের' দিকে এগোতে চাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরান এখন বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা এবং ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল লঞ্চারের ওপর নির্ভর করছে যা শনাক্ত করা ও লক্ষ্যবস্তু বানানো কঠিন।
ডোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, "কয়টি হামলা হলো তা বড় কথা নয়, একটি সফল ড্রোন হামলাই নিরাপত্তার বোধ চূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট।" ইরানের শাহেদ ১৩৬ ড্রোনগুলো সস্তা এবং সাধারণ কারখানায় বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা যায়, যা ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে সক্ষম।
সোমবারও দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন সংক্রান্ত ঘটনায় আগুন ধরে ফ্লাইট চলাচল সাময়িক ব্যাহত হয়েছে। ফুজাইরা শিল্প এলাকায় ড্রোন হামলা হয়েছে এবং ইসরায়েলে সাইরেন বেজেছে। হরমোজ প্রণালীতে হামলার ভয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত ইরানের 'অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলের' অংশ। তেহরান ইতিমধ্যে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে নিয়ে গেছে এবং বিশ্ববাজারকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। কাতার তাদের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, বাহরাইন তেলের চালানে 'ফোর্স ম্যাজিউর' ঘোষণা করেছে এবং ইরাকের প্রধান তেলখনিগুলোর উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমেছে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, যদি ইরান তেলের দাম এভাবে বাড়াতে থাকে, তবে এটি ইরানের ওপর ফেলা মার্কিন বোমার চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করবে।
