যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইসরায়েলের এফ-৩৫ বহরের আধুনিকায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলের এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বহরে বড় ধরনের আপগ্রেড উদ্যোগ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার– লকহিড মার্টিন ইসরায়েলের এফ-৩৫ বহরের জন্য অতিরিক্ত সফটওয়্যার উন্নয়নে ১ কোটি ১৪ লাখ ডলারের একটি সংশোধিত চুক্তি পেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় "প্রোডাকশনাইজড প্লাস বিল্ডস" নামে পরিচিত তিনটি সফটওয়্যার ডেটা লোড তৈরি করা হবে। বিদ্যমান এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার বেসলাইন থেকে এগুলো তৈরি করা হবে এবং কাজটি ইসরায়েলের নিজস্ব "সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন ফেজ–২" কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালিত হবে, যেখানে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং উভয় কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত।
এই কর্মসূচির সময়কাল নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে জল্পনা তৈরি হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ'র বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলোকে নতুনভাবে অভিযোজিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীই একমাত্র বিদেশি বাহিনী, যারা নিজেদের এফ-৩৫ বহর ব্যাপকভাবে কাস্টমাইজ করার এবং নিজস্ব অ্যাভিওনিক্স সংযোজনের অনুমতি পেয়েছে ওয়াশিংটনের থেকে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, শুধু স্টেলথ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বিমানটির টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত করা যাবে না—এই উদ্বেগ থেকেই এই কাস্টমাইজেশনের দাবি ওঠে। যদিও ইসরায়েলি প্রকৌশলীরা বিমানটির মূল সোর্স কোডে সরাসরি পরিবর্তন আনতে পারেন না, তবে তারা এর ওপর অতিরিক্ত কোড সংযোজন করতে পারেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের নিজস্ব ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি এতে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা এই যুদ্ধবিমানের ইসরায়েলি ধরনকে অনন্য করে তুলেছে।
ইসরায়েল প্রথম দফায় ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর ১৯টি এফ-৩৫ অর্ডার করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৭ সালের আগস্টে নতুন অর্ডারের মাধ্যমে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০-এ। এই বিমানগুলো দিয়ে ইসরায়েল নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে দুটি স্কোয়াড্রন গঠন করে।
ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের লাহাভ ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক বেনি কোহেন এফ-৩৫ কাস্টমাইজেশন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বলেন, "এটি একটি ওপেন আর্কিটেকচার, যা এফ-৩৫-এর কেন্দ্রীয় সিস্টেমের ওপর বসানো হয়—অনেকটা আইফোনে অ্যাপ ইনস্টল করার মতো। এতে বিমানটির মূল কাঠামো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু ইসরায়েলি বিমানবাহিনীকে অত্যাধুনিক ও অভিযোজিত প্রসেসিং সক্ষমতা দেয়, যা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়।"
তিনি আরও বলেন, এর ফলে ভবিষ্যতে এফ-৩৫আই সংস্করণে আরও উন্নত সক্ষমতা সংযোজনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ইসরায়েলের এফ-৩৫ বহরের জন্য দেশীয় ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সফটওয়্যার উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবর্তনগুলো পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত পরীক্ষামূলক বিমানও তৈরি করতে হয়েছে।
ইসরায়েলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। তবে ব্লক–৪ সফটওয়্যার না থাকায়—যা বিলম্বিত হচ্ছে—উচ্চমাত্রার যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত। ২০২৫ সালে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় এসব বিমান মূলত তাদের উন্নত সেন্সর ও ডেটা লিংকের মাধ্যমে পুরনো চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে ব্যবহার করা হয়।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির যুদ্ধে এফ-৩৫ সরাসরি অংশগ্রহণ করে।
ব্লক–৪ সফটওয়্যার ছাড়া এফ-৩৫ থেকে এয়ার-টু-সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র, যেমন এজিএম-৮৮ হার্ম ব্যবহার করা যায় না, যা শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ইসরায়েলের এফ-৩৫ কার্যত চ্যালেঞ্জহীন ছিল, কারণ একই প্রজন্মের অন্য কোনো যুদ্ধবিমান সেখানে ছিল না। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে আলজেরিয়া রাশিয়ার সুখই-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি দেশও সু-৫৭ কেনার অর্ডার দিয়েছে। এর পর থেকেই জোর জল্পনা চলছে—এই ক্রেতা দেশটি সম্ভবত ইরান হতে পারে।
