আটক এরফান সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না: ইরানের বিচার বিভাগ
ইরানের বিচার বিভাগ সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এবং তা কার্যকরের সময় নির্ধারণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। খবর বিবিসি'র।
নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেনগাউ সপ্তাহের শুরুতে জানায়, ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানিকে আটকের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তার পরিবারকে জানানো হয়েছিল যে বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
তবে বুধবার হেনগাউ পরিবারটির বরাত দিয়ে জানায়, সোলতানির মৃত্যুদণ্ড 'স্থগিত' করা হয়েছে। যদিও সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে এখনো 'গভীর উদ্বেগ' রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার বিষয়ে এর আগে ইরানকে সতর্ক করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবরটি শুনে তিনি বলেন, 'এটি ভালো খবর। আশা করি এমনটাই চলতে থাকবে!'
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, বিচার বিভাগ বলেছে—সোলতানির বিরুদ্ধে 'জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র' এবং 'রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার'-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। বিদেশি গণমাধ্যমে সোলতানির মৃত্যুদণ্ড হতে পারে—এমন খবরকে তারা 'নির্লজ্জ মিথ্যাচার' বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও মার্কিন টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কাউকে ফাঁসি দেওয়ার 'কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই'।
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার গুঞ্জনের মধ্যেই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তিনি 'অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ' নেবেন। এর পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসে।
বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, 'বিপরীত পক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র' তাকে নিশ্চিত করেছে যে 'ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই।'
মানবাধিকার সংস্থা ও সোলতানির পরিবারের তথ্যমতে, কাপড়ের দোকানের মালিক এরফান সোলতানিকে গত বৃহস্পতিবার তেহরানের পশ্চিমে ফারদিস শহরে বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে আইআরআইবি জানায়, বিচার বিভাগের দাবি অনুযায়ী তাকে শনিবার 'দাঙ্গা' চলাকালে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বর্তমানে তাকে পার্শ্ববর্তী কারাজ শহরের একটি কারাগারে রাখা হয়েছে।
ইউরোপ থেকে বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে সোলতানির এক আত্মীয় সোমাইয়া বলেন, এরফান এখনো কারাগারে আছেন এবং তাকে নিয়ে তিনি গভীরভাবে শঙ্কিত। ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় খুব কম তথ্যই তারা জানতে পারছেন।
তবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া একটি বার্তার বরাত দিয়ে তিনি জানান, সোলতানির কোনো আইনজীবী নেই এবং তার পরিবার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে।
সোমাইয়া বলেন, 'এরফান আমাদের পরিবারের কলিজার টুকরা। সে খুবই শান্ত ও দয়ালু স্বভাবের।' তিনি জানান, এরফান ছবি তুলতে, খেলাধুলা করতে ও পশুপাখি ভালোবাসত। নিজের ও ইরানের জনগণের জন্য সে কেবল 'মৌলিক অধিকার' চেয়েছিল।
তিনি বলেন, 'নিজের এবং অন্য তরুণদের নিয়ে তার হাজারো স্বপ্ন ছিল।' সোমাইয়ার ভাষ্য, ইরান সরকার ভেবেছিল, এরফানকে মৃত্যুদণ্ড দিলে 'মানুষ ভয় পাবে এবং বিক্ষোভ থেমে যাবে'।
তিনি আরও বলেন, 'এরফানকে গ্রেপ্তারের কোনো কারণ ছিল না। এমন হাজারো এরফান রয়েছে। সরকারের একমাত্র কৌশল হলো, এভাবেই বিক্ষোভ দমন করা।'
বৃহস্পতিবারের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাঁচজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কর্মকর্তাকে 'শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরান সরকারের নৃশংস দমন-পীড়নের মূল কারিগর' হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির সচিব আলী লারিজানি। তিনি বিক্ষোভ দমনের বিষয়টি সমন্বয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া পশ্চিমের লরেস্তান ও দক্ষিণের ফারস প্রদেশের রেভল্যুশনারি গার্ড ও পুলিশের কমান্ডাররাও তালিকায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের মতে, ওই দুই প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের বিচার বিভাগের বিবৃতির জবাবে নরওয়েভিত্তিক সংগঠন 'ইরান হিউম্যান রাইটস'-এর পরিচালক বলেছেন, বন্দী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেওয়া সেখানে নতুন কোনো ঘটনা নয়।
ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেন মোহসেনি-এজেই গ্রেপ্তারকৃত 'দাঙ্গাবাজদের' দ্রুত বিচার ও শাস্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
বুধবার দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, 'যারা রাস্তায় মানুষের গলা কেটেছে বা মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের যত দ্রুত সম্ভব বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি দ্রুত এটা না করি, তবে এর কার্যকর প্রভাব থাকবে না।'
এদিকে ইরানের বিচারমন্ত্রী আমিন হোসেন রাহিমি বলেছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চলা বিক্ষোভে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই 'নিশ্চিতভাবে অপরাধী'।
গত তিন বছরে ২০২২ সালের 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরানে অন্তত ১২ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা 'জবানবন্দি' এবং চরম অন্যায্য বিচারের ভিত্তিতে এসব দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে তেহরানের দোকানদাররা ধর্মঘট ডাকলে বর্তমান বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। এই বিক্ষোভ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে মোড় নেয়।
বিক্ষোভকারীরা 'স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক' এবং 'এই বছরই সাইয়্যেদ আলী [খামেনি]-র পতন হবে'— এরকম স্লোগান দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগে কর্তৃপক্ষ প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)-এর তথ্যমতে, অস্থিরতা শুরুর পর থেকে অন্তত ২,৪৫৩ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে ১৪ জন শিশু, নিরাপত্তা বাহিনী বা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫৬ জন ব্যক্তি এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১৮,৪৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৩,৪২৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং তাদের ধারণা, প্রায় ২০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ বৃহস্পতিবার জানান, একজন কানাডীয় নাগরিক 'ইরান কর্তৃপক্ষের হাতে ইরানে মারা গেছেন'। তবে তিনি ওই নাগরিকের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, 'ইরানি শাসনের নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিজেদের কণ্ঠ শোনাতে ইরানি জনগণ যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছে, তার জবাবে শাসকগোষ্ঠী মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে।'
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন জানিয়েছে, গত ১০ জানুয়ারি গিলান প্রদেশে 'দায়িত্ব পালনরত অবস্থায়' ইরানি রেড ক্রিসেন্টের কর্মী আমির আলী লতিফি নিহত হয়েছেন এবং তার পাঁচজন সহকর্মী আহত হয়েছেন।
