বিক্ষোভে আটক, ২ দিনের বিচারে মৃত্যুদণ্ড, শেষ মুহূর্তে স্থগিত; কে এই ইরানি তরুণ এরফান সোলতানি?
গেল বুধবার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড। পরিবারকে সেভাবেই জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে মানবাধিকার সংস্থা ও পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, স্থগিত করা হয়েছে ইরানি এই তরুণের ফাঁসি।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আটক হওয়ার পর মাত্র দুই দিনের তড়িঘড়ি বিচারে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়।
নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা 'হেনগাউ' জানায়, গত বৃহস্পতিবার তেহরানের পশ্চিমে ফারদিস শহর থেকে এরফানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর কয়েক দিন পরই কর্তৃপক্ষ তার পরিবারকে জানায়, বুধবার এরফানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন ধার্য করা হয়েছে। তবে কেন বা কোন প্রক্রিয়ায় এত দ্রুত এই রায় দেওয়া হলো, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে ইরানের বিচার বিভাগ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। বিক্ষোভে আটক অন্য কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। সরকারের নির্দেশে দেশটিতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় প্রকৃত তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
হেনগাউয়ের কর্মকর্তা আউয়ার শেখি বলেন, 'আমাদের আশঙ্কা, এরফানের মতো আরও অনেক ঘটনা ঘটছে যা সামনে আসছে না।' তিনি বলেন, অতীতের যেকোনো বিক্ষোভের তুলনায় এবার ইরানি কর্তৃপক্ষ অনেক দ্রুত ও কঠোরভাবে দমন–পীড়ন চালাচ্ছে।
ইরানের ফারদিস শহরের বাসিন্দা ও পেশায় পোশাক ব্যবসায়ী এরফান সোলতানির এক স্বজন গেল মঙ্গলবার জানান, আদালত মাত্র দুই দিনের মধ্যে তড়িঘড়ি করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হেনগাউ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এরফানকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, ইরানি কর্তৃপক্ষ এরফানের মামলার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিচ্ছে না। শুধু জানানো হয়েছে, বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে।
এরফানের বোন একজন আইনজীবী। তিনি ভাইয়ের মামলার আইনি লড়াই চালাতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ তাকে সাফ জানিয়ে দেয়, 'এখানে লড়াই করার মতো কিছু নেই'। বিবিসি রেডিও ৪-এর 'টুডে' অনুষ্ঠানে হেনগাউয়ের কর্মকর্তা আউয়ার শেখি এসব কথা জানান।
শেখি বলেন, 'এরফান কেবল ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির বিপক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। শুধু এ কারণেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও জানান, ইরানে সাধারণত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আসামিকে পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ এরফানের পরিবারকে জানিয়েছিল, দণ্ড কার্যকরের আগে তাদের দেখা করতে দেওয়া হবে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর থেকে এখন পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে এরফানের কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।
শেখি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইরানে এরফানের মতো আরও অনেকে হয়তো একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে, ইরানে আটক বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে 'খুবই কঠোর ব্যবস্থা' নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, 'বিক্ষোভ চালিয়ে যান, সাহায্য আসছে।'
বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিলের ঘোষণাও দিয়েছেন ট্রাম্প। অবশ্য পরে আরেকটি বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বিশ্বস্ত সূত্রে তিনি জেনেছেন যে ইরানে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হচ্ছে এবং আপাতত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের নেই।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিবিসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরান থেকে সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এই ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি' (এইচআরএএনএ) হতাহতের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির দাবি, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪১৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২টি শিশুও রয়েছে।
সংঘর্ষের মাঝে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া আরও ১০ সাধারণ নাগরিক। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকার-সমর্থিত অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্যমতে, এই অস্থিরতার মধ্যে অন্তত ১৮ হাজার ৪৩৪ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি-এজেই বিক্ষোভকারীদের 'দাঙ্গাবাজ' আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বুধবার তিনি বলেন, যারা 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড' চালিয়েছে, তাদের বিচার ও শাস্তির বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। মূল অভিযুক্তদের বিচারপ্রক্রিয়া সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলেও জানান তিনি।
মানবাধিকার সংস্থা হেনগাউ এক বিবৃতিতে বলেছে, এরফান সোলতানির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংস্থাটি বলছে, তড়িঘড়ি ও অস্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ডকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান সরকার।
মুদ্রার মান পতন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮০টির বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানে ২০২২ সালের 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের জেরে গত তিন বছরে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ওই নজিরবিহীন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। মাহসার বিরুদ্ধে 'যথাযথভাবে' হিজাব না পরার অভিযোগ এনেছিল পুলিশ।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বিক্ষোভের জেরে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর। সেদিন মেহরান বাহরামিয়ান নামের এক ব্যক্তিকে ইস্পাহান শহরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'ইরান হিউম্যান রাইটস' ওই সময় জানিয়েছিল, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য মেহরানের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং তিনি ন্যায়বিচার পাননি।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে সেমিরোম শহরে এক বিক্ষোভে রিভল্যুশনারি গার্ডের এক সদস্যকে হত্যার অভিযোগে মেহরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইরানের একটি আদালত 'সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে শত্রুতা'র অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
