আর্কটিকে তাপমাত্রা বাড়ায় গলছে বরফ, বিষাক্ত খনিজে ‘লালচে’ হয়ে উঠছে আলাস্কার নদীর পানি
গত এক বছরে আর্কটিক অঞ্চলে রেকর্ড উষ্ণতা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এর ফলে দ্রুত গলছে পারমাফ্রস্ট (বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বরফাবৃত মাটি)। আর বরফগলা পানির তোড়ে আলাস্কার উত্তরাঞ্চলীয় ২০০টির বেশি নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত খনিজ পদার্থ। এতে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়েছে সেখানকার স্যামন মাছ—এমনই তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
গত মঙ্গলবার (ডিসেম্বর ১৬) নিউ অরলিন্সে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)-এর তত্ত্বাবধানে সরকারি ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মিলে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। নরওয়ের সভালবার্ড দ্বীপ থেকে শুরু করে গ্রিনল্যান্ডের বরফের স্তর এবং কানাডা ও আলাস্কার তুন্দ্রা অঞ্চল—সর্বত্রই দ্রুত পরিবেশগত পরিবর্তনের চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
নোয়া'র গবেষণা বিভাগের সহকারী প্রশাসক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিজ্ঞানী স্টিভ থার বলেন, 'পুরো পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের ওপর আর্কটিক অঞ্চলের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।' গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—এই এক বছরে আর্কটিক অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল গত ১২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নোয়া'র নজর এখন গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের মতো বাণিজ্যিক দিকে। গত এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন নোয়া'র গবেষণা শাখাটিই বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ও বিজ্ঞান শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। এমনকি চলতি বছরের শুরুতে নোয়া'র এক হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করে ট্রাম্প প্রশাসন।
অবশ্য পরে তাদের মধ্যে ৪৫০ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাদের অধিকাংশই জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের।
বাজেট কমানোর প্রস্তাব থাকলেও নোয়া'র তত্ত্বাবধানেই এবারের প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। এতে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং নাসাসহ বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থার গবেষকেরা।
গত ২০ বছর ধরে আর্কটিক অঞ্চলের পরিবর্তনের ওপর নজর রাখছে নোয়া। এবারের গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঞ্চলে বৃষ্টি ও তুষারপাত—উভয়ই রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।
কলোরাডোর 'ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টার'-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও এই প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ম্যাথিউ ড্রুকেনমিলার বলেন, 'একই বছরে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এমন ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়া সত্যিই বিস্ময়কর।'
ড্রুকেনমিলার জানান, ১৯৮০ সালের পর থেকে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় আর্কটিক অঞ্চল প্রায় তিন গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এই উষ্ণতা আর্কটিক অঞ্চলে বৃষ্টি ও তুষারপাতের সময় ও পরিমাণে প্রভাব ফেলছে, যা শেষ পর্যন্ত সেখানকার মৎস্যসম্পদ, বন্যপ্রাণী এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলছে।
পারমাফ্রস্ট গলে বিষক্রিয়া
আর্কটিক অঞ্চলের মাটির বিশাল অংশজুড়েই রয়েছে পারমাফ্রস্ট বা সারা বছর বরফে জমে থাকা মাটি। পাথর ও জৈব উপাদানের এই মিশ্রণটি ২০০০ সালের শুরু থেকেই গলতে শুরু করেছে। গবেষকরা এখন দেখছেন, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে উত্তর আলাস্কার নদীগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের (অ্যাঙ্করেজ) গবেষক ও হাইড্রোলজিস্ট জশুয়া কোচ জানান, ২০১৯ সালে কয়েকটি নদীতে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে। এখন আলাস্কার ব্রুকস রেঞ্জ পর্বতমালার উত্তরে ২০০টিরও বেশি নদী অববাহিকায় এই দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে।
জশুয়া কোচ ও তার দল কানাডা সীমান্ত থেকে আর্কটিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৯৫ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে (নর্থ স্লোপ) আকাশপথে ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জরিপ চালিয়েছেন।
ড. কোচ বলেন, 'আমরা দেখলাম, কিছু ঝরনা ও নদীর পানি কমলা রঙের হয়ে যাচ্ছে। অথচ এগুলো একেবারেই নির্জন ও আদিম এলাকা। এখানে কোনো খনি নেই, মানুষের কোনো আনাগোনাও নেই।'
গবেষকরা বলছেন, মূলত পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় মাটির নিচে প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা পাইরাইট (আয়রন সালফাইড খনিজ) বাতাস ও পানির সংস্পর্শে আসছে। এতে অক্সিডেশন বা জারণ বিক্রিয়া ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, পারমাফ্রস্ট গলে যাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি মাটির গভীর স্তরে চুঁইয়ে ঢুকছে।
সরেজমিনে গিয়ে গবেষকরা দেখেন, পাইরাইটসমৃদ্ধ পাহাড়ের ঢাল ও ঝরনাগুলো থেকে মরচে ধরা রঙের পানি বেরিয়ে আসছে। তারা তুন্দ্রা অঞ্চলের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে থাকা অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও দস্তার বিষাক্ত মাত্রাও শনাক্ত করেছেন, যা জলাশয়ে মিশছে। জশুয়া কোচ বলেন, 'আমরা এমন জায়গাও দেখেছি, যেখানে মাটি ফুঁড়ে সরাসরি পানি বেরিয়ে আসছে।'
বিষাক্ত ও অম্লীয় এই পানির কারণে মারা যাচ্ছে পোকামাকড় ও নানা জলজ প্রাণী। এগুলোই আবার স্যামনসহ অন্যান্য মাছের প্রধান খাবার। আর এই মাছের ওপরই নির্ভরশীল ওই অঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে কোবুক ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের আকিলিক নদীর স্বচ্ছ পানি গ্রীষ্মকালে হঠাৎ কমলা রং ধারণ করে। এতে নদীর সব মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়।
মাছের শরীরে এখনো বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া না গেলেও বিজ্ঞানীরা নদী ও স্যামন মাছের ওপর কড়া নজর রাখছেন। তবে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই 'মরচে ধরা' পানির দূষণ যদি ইউকনের মতো বড় নদীগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা আলাস্কার ৫৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের (৫৪১ মিলিয়ন) বিশাল স্যামন বাণিজ্যে ধস নামাতে পারে।
প্যাসিফিক সিফুড প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোল কিম্বল জানান, স্যামন মাছ পানির রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি বলেন, 'বিষক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে স্যামন মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এমনকি ডিম পাড়ার জায়গা চিনতেও তারা ভুল করতে পারে।'
