শুরু হয়েছে নতুন প্রতিযোগিতা—শেষ পর্যন্ত কি শুধু বিলিয়নিয়ারদের দখলেই চলে যাবে গোটা মহাকাশ?
প্রাচীনকালে মানুষ বিশ্বাস করত, সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। ষোড়শ শতাব্দীতে কোপারনিকাস ও তার সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা সেই ভুল ভাঙলেন। তারা জানালেন—পৃথিবী নয়, বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র। এরপর টেলিস্কোপ আর মহাকাশযানের আবিষ্কার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা আসলে কতটা ক্ষুদ্র, কতটা নগণ্য।
আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ বা মিল্কিওয়েতেই রয়েছে হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র। এর প্রতিটিই একেকটা সূর্যের মতো। সেগুলোর চারপাশে আবার ঘুরছে অসংখ্য গ্রহ। ১৯৯৫ সালে হাবল টেলিস্কোপের তোলা 'ডিপ ফিল্ড' ছবিটি আমাদের চিন্তার জগৎ আরও বদলে দিল। জানা গেল, দৃশ্যমান মহাবিশ্বে এমন হাজার হাজার কোটি ছায়াপথ ছড়িয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের সংজ্ঞা অনুযায়ী, পৃথিবী ও এর বায়ুমণ্ডলের বাইরে যা কিছু আছে, সবই মহাকাশ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন তোলা হয়, 'মহাকাশের মালিক কে?'—তবে তা শুনতে বেশ হাস্যকরই লাগবে। পুরো মহাবিশ্বের মালিকানা দাবি করাটা কেবল আত্মম্ভরিতাই নয়, বোকামিও বটে।
মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটি ভিন্ন যুগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি ছিল 'সংঘাতের যুগ'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মারণাস্ত্র কত দূরে ছোড়া যায়, সেই প্রতিযোগিতা থেকেই মূলত মহাকাশযাত্রার শুরু। এরপর স্নায়ুযুদ্ধকালে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই মহাকাশ গবেষণাকে ত্বরান্বিত করে।
দ্বিতীয় যুগটি ছিল 'সহযোগিতার'। ১৯৭৫ সালে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গঠন এবং সোভিয়েত ও মার্কিন নভোযানের সংযোগ বা 'ডকিং' ছিল এর প্রতীক।
তবে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি তৃতীয় এক যুগের দ্বারপ্রান্তে—'বাণিজ্যিকীকরণের যুগ'। মহাকাশ এখন আর কেবল রাষ্ট্রগুলোর বিচরণক্ষেত্র নয়; ধনকুবের, বেসরকারি কোম্পানি আর স্টার্টআপগুলো এখন মহাকাশে ভ্রমণের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মহাকাশ শিল্পে বাণিজ্য অবশ্য নতুন কিছু নয়। এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ অনেক আগে থেকেই আছে। তবে এখনকার পরিবর্তনটা ভিন্ন—এখন মানুষ নিজেই ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ। আমরা মহাকাশ 'অনুসন্ধান' থেকে ক্রমশ 'শোষণের' দিকে ঝুঁকছি।
ব্যক্তিগত মহাকাশ স্টেশন, পর্যটন কিংবা চাঁদ ও গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণ—এসবই এখন নতুন বাস্তবতা। তাই মহাকাশের মালিকানা আসলে কার, সেই আইনি, নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলো এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
আইনিভাবে বললে, মহাকাশ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি অনেক আগেই গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যখন রকেট প্রথম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করল, তখনই জাতিসংঘ মহাকাশ নীতিমালার খসড়া তৈরি করে। ১৯৬৭ সালের 'আউটার স্পেস ট্রিটি' বা মহাকাশ চুক্তিতে কিছু চমৎকার নীতি ঠিক করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তসহ পুরো মহাকাশই সব দেশের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। অর্থনৈতিক বা বৈজ্ঞানিক সামর্থ্য যা-ই হোক, মহাকাশ হবে সমগ্র মানবজাতির।
শুনতে খুব ভালো শোনালেও এই নীতি এখন হুমকির মুখে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মহৎ উদ্দেশ্যগুলো কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। যখন কোনো বেসরকারি কোম্পানি চাঁদে বা অন্যান্য গ্রহে মূল্যবান খনিজ খুঁজে পাবে, তখন সেই লভ্যাংশ কে পাবে?
মহাকাশ অভিযানের বাণিজ্যিকীকরণ প্রয়োজন। কারণ, লাভ না থাকলে মানুষ অনন্তকাল পৃথিবীতেই আটকে থাকবে। মহাকাশ অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সরকারের একার পক্ষে এই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। যদি গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণ বা হিলিয়াম-৩ সংগ্রহ করে মহাকাশ অভিযানের খরচ মেটানো যায় এবং তা আমাদের জ্ঞান ও সক্ষমতা বাড়ায়, তবে তা ইতিবাচক।
কিন্তু এই বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে স্বচ্ছতা ও সমতা থাকতে হবে। তা না হলে আমরা অতীতে পৃথিবীতে যেসব ভুল করেছি, মহাজাগতিক পরিসরেও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটার ঝুঁকি থেকে যাবে।
এক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদাহরণ টানা যেতে পারে। ব্রিটিশ এই বেসরকারি কোম্পানিটি বাণিজ্য করতে এসে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, একসময় তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল ব্রিটেনের চেয়েও বড়। শুরুটা হয়েছিল বাণিজ্য দিয়ে, শেষ হয়েছিল আধিপত্যে।
মহাকাশেও কি এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? আমাদের সৌরজগতে যদি আজকের টেক জায়ান্ট আর ধনকুবেররা প্রবেশাধিকার, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ভিনগ্রহের সম্পদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তবে তা মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হবে। উদ্ভাবন ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে ঠিকই, কিন্তু মহাকাশ যেন মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
চাঁদ এখন এক কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়। বিজ্ঞানীদের জন্য এটি গবেষণাগার—গ্রহের ইতিহাস জানা আর নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জায়গা। আবার ব্যবসায়ীদের কাছে এটি লোভনীয় লক্ষ্যবস্তু। চাঁদের মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফ ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব, যা রকেটের জ্বালানি হতে পারে। আবার পৃথিবীর চেয়ে মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়ায় মহাকাশ অভিযানের 'লঞ্চপ্যাড' হিসেবেও চাঁদ আদর্শ। এমনকি ফিউশন চুল্লির জ্বালানি 'হিলিয়াম-৩' পাওয়ার জন্যও চাঁদের দিকে নজর অনেকের।
সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু প্রশ্ন হলো—চাঁদের সম্পদ কে এবং কীভাবে ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে কে?
১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি (আউটার স্পেস ট্রিটি) অনুযায়ী, কোনো দেশ মহাকাশের বা মহাজাগতিক বস্তুর মালিকানা দাবি করতে পারে না। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে কী হবে, সে বিষয়ে চুক্তিটি স্পষ্ট নয়। এই আইনি অস্পষ্টতার সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও লুক্সেমবার্গের মতো দেশ নিজেদের কোম্পানির জন্য মহাকাশ খনির আইন তৈরি করছে।
এভাবে প্রতিটি দেশ যদি নিজেদের মতো নিয়ম বানাতে থাকে, তবে মহাকাশ এক অরাজক 'ওয়াইল্ড ওয়েস্ট'-এ পরিণত হতে পারে, যা সংঘাতও ডেকে আনতে পারে। মহাকাশের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত বৈশ্বিক নীতিমালা।
মহাকাশকে অ্যান্টার্কটিকার মতো 'সবার সমান অধিকারের জায়গা' হিসেবে দেখা উচিত। অ্যান্টার্কটিকা যেমন কোনো দেশের নয়, আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় সেখানে সবাই শান্তিপূর্ণ গবেষণা করতে পারে—মহাকাশেও তেমন ব্যবস্থা দরকার। সম্মিলিত তত্ত্বাবধানই এখানে মূল চাবিকাঠি।
মহাকাশ যুগে আমাদের আচরণই ঠিক করে দেবে আমরা কেমন জাতি। আমরা কি পৃথিবীর পুরোনো রেষারেষি আর লোভ নিয়ে মহাকাশে যাব, নাকি কৌতূহল আর দায়িত্ববোধ নিয়ে এক হয়ে কাজ করব?
তবুও আশা হারানো যাবে না। মহাকাশ মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। মহাকাশ থেকে যখন নভোচারীরা পৃথিবীর দিকে তাকান, তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে, যাকে বলা হয় 'ওভারভিউ ইফেক্ট'। তারা দেখেন, পৃথিবীটা আসলে কত ঠুনকো, এবং এটি আমাদের সবার। এই বোধটুকু ধরে রেখে যদি আমরা তারার দেশে পা বাড়াতে পারি, তবেই মহাকাশ অভিযান সবার জন্য কল্যাণকর হবে।
