মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার: কেন এই অদ্ভুত পরিকল্পনা ইলন মাস্কের?
ইলন মাস্কের দুই কোম্পানি স্পেস-এক্স এবং এক্স-এআই একীভূত হতে যাচ্ছে। গুগল, মেটা এবং ওপেনএআই-এর মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে জিততেই মাস্কের এই উদ্যোগ।
মহাকাশভিত্তিক এআই কম্পিউটিং নিয়ে যা জানা যাচ্ছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
মহাকাশভিত্তিক এআই ডেটা সেন্টার আসলে কী?
মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টারের ধারণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এতে শত শত সৌরচালিত স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ ব্যবহার করা হবে। এগুলো এক্স-এআই-এর 'গ্রোক' বা ওপেনএআই-এর 'চ্যাটজিপিটি'-র মতো এআই সিস্টেমগুলোর বিশাল কম্পিউটিং চাহিদা সামলাবে। বর্তমানে পৃথিবীতে বিশাল সব ডেটা সেন্টার চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। খরচও বাড়ছে হু হু করে।
সমর্থকদের মতে, বায়ুমণ্ডলের ওপরে থাকলে প্রায় সবসময় সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এ ছাড়া পৃথিবীর বুকে ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে যে বিশাল খরচ হয়, মহাকাশে সেই ঝামেলা নেই। ফলে এআই প্রসেসিং অনেক বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে।তবে প্রকৌশলী ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, বাণিজ্যিকভাবে এটি সফল হতে এখনো কয়েক বছর বাকি।
মহাকাশের আবর্জনা বা 'স্পেস ডেব্রিস', মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষা করা, মেরামতের সুযোগ না থাকা এবং উৎক্ষেপণের খরচ—এসবই বড় ঝুঁকি। ডয়েচে ব্যাংকের ধারণা, ২০২৭-২৮ সালের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে ছোট পরিসরে অরবিটাল ডেটা সেন্টার চালু হতে পারে। প্রযুক্তি ও খরচ যাচাইয়ের পর যদি তা সফল হয়, তবে ২০৩০-এর দশকে শত শত বা হাজার হাজার স্যাটেলাইটের বিশাল নেটওয়ার্ক দেখা যেতে পারে।
মাস্ক কেন এটা করতে চাইছেন?
ইতিহাসের সবচেয়ে সফল রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেস-এক্স। স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবার অংশ হিসেবে তারা ইতিমধ্যেই হাজার হাজার স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠিয়েছে। যদি মহাকাশভিত্তিক এআই কম্পিউটিং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হয়, তবে স্পেস-এক্সই আছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। এআই-এর জন্য উপযোগী স্যাটেলাইট ক্লাস্টার তৈরি বা মহাকাশে কম্পিউটিং ব্যবস্থা চালু করতে তারাই সবচেয়ে এগিয়ে।
চলতি মাসের শুরুতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মাস্ক বলেছিলেন, 'মহাকাশে সৌরচালিত ডেটা সেন্টার তৈরি করা খুব সহজ হিসাব। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রাখার জন্য মহাকাশই হবে সবচেয়ে কম খরচের জায়গা। আগামী দুই, সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যেই এটি সত্য প্রমাণিত হবে।'
রয়টার্স জানিয়েছে, স্পেস-এক্স এ বছরই শেয়ার বাজারে আসার (আইপিও) চিন্তা করছে। এতে রকেট ও স্যাটেলাইট কোম্পানিটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেখান থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ এআই ডেটা সেন্টার স্যাটেলাইট তৈরির কাজে লাগানো হবে বলে জানা গেছে।
মাস্কের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কী করছে?
জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনও মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতার ভবিষ্যদ্বাণী হলো, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মহাকাশে 'বিশাল গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার' খরচ কমিয়ে পৃথিবীর ডেটা সেন্টারগুলোকে টেক্কা দেবে। কারণ সেখানে নিরবচ্ছিন্ন সৌরশক্তি পাওয়া যায় এবং তাপ সরাসরি মহাকাশে ছেড়ে দেওয়া যায়।
এনভিডিয়া সমর্থিত 'স্টারক্লাউড' ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখিয়েছে। গত মাসে ফ্যালকন-৯ রকেটে করে তাদের 'স্টারক্লাউড-১' স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এতে রয়েছে এনভিডিয়া এইচ-১০০ চিপ, যা মহাকাশে পাঠানো এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই চিপ। এটি গুগলের ওপেন সোর্স 'জেমা' মডেলের প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার কাজ করছে। কোম্পানিটির লক্ষ্য হলো স্যাটেলাইটের এমন এক 'হাইপারক্লাস্টার' তৈরি করা, যা প্রায় পাঁচ গিগাওয়াট কম্পিউটিং শক্তি জোগাবে। এটি পৃথিবীর বড় কয়েকটি ডেটা সেন্টারের সমান।
গুগলও 'প্রজেক্ট সানক্যাচার' নিয়ে এই দৌড়ে আছে। এটি একটি গবেষণাধর্মী উদ্যোগ। তাদের লক্ষ্য হলো সৌরচালিত স্যাটেলাইটে টেনসর প্রসেসিং ইউনিট বসিয়ে একটি 'অরবিটাল এআই ক্লাউড' বা মেঘের রাজ্যে এআই নেটওয়ার্ক তৈরি করা। পার্টনার 'প্ল্যানেট ল্যাবস'-এর সঙ্গে মিলে ২০২৭ সালের দিকে তারা প্রথম প্রোটোটাইপ বা নমুনা উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে।
পিছিয়ে নেই চীনও। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশভিত্তিক এআই ডেটা সেন্টার চালু করে 'স্পেস ক্লাউড' তৈরির পরিকল্পনা করছে তারা। বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। চীনের প্রধান মহাকাশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান 'চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কর্পোরেশন' গিগাওয়াট-মানের মহাকাশ ডিজিটাল-ইন্টেলিজেন্স অবকাঠামো গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
