সেমিকন্ডাক্টরের উপাদান বানাতে মহাকাশে ‘কারখানা’ পাঠাচ্ছে যে ব্রিটিশ কোম্পানি
ব্রিটিশ একটি কোম্পানি মহাকাশে ভাসমান 'কারখানা' তৈরি করছে। তাদের লক্ষ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার, এআই ডেটা সেন্টার এবং প্রতিরক্ষা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করা।
ওয়েলসের কার্ডিফভিত্তিক কোম্পানিটির নাম 'স্পেস ফোর্জ'। তারা মহাকাশে অতি-উচ্চমানের ক্রিস্টাল 'সিডস' তৈরির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই সিড পৃথিবীতে এনে সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। এসব সেমিকন্ডাক্টর যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটার এবং পরিবহন খাতে কাজে লাগবে।
২০২৫ সালের জুনে তারা স্পেস-এক্স রকেটে করে 'ফোর্জস্টার-১' নামে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের আকারের একটি কারখানা-স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠায়। সেখানে তারা প্লাজমা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি হলো ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১,৮৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় উত্তপ্ত গ্যাস। ভবিষ্যতে উন্নত মানের ক্রিস্টাল তৈরিতে এটি কাজে লাগবে।
স্পেস ফোর্জের সিইও এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া ওয়েস্টার্ন বলেন, 'পৃথিবীর তুলনায় মহাকাশ শিল্পের জন্য এক অতুলনীয় জায়গা।'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা শূন্যর কাছাকাছি মাধ্যাকর্ষণে সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করলে এর পরমাণুগুলো অনেক সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে।
ওয়েস্টার্ন আরও জানান, মহাকাশের বায়ুশূন্য পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ফলে পৃথিবীতে তৈরি ক্রিস্টালের চেয়ে মহাকাশে তৈরি ক্রিস্টালের বিশুদ্ধতা শত বা হাজার গুণ বেশি হয়। সুশৃঙ্খল গঠন এবং কম ভেজাল থাকার ফলে সেমিকন্ডাক্টরের কার্যক্ষমতা 'বিশাল মাত্রায়' বেড়ে যায় বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
ওয়েস্টার্ন বলেন, 'ফোর্জস্টার-১ মূলত উৎপাদনের যন্ত্রটি পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়েছে।' তিনি জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে স্পেস ফোর্জ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা কক্ষপথে পাঠাতে চায়।
যেসব প্রতিষ্ঠানের খুব শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর প্রয়োজন, তাদের কাছেই এই উপাদান বিক্রি করতে চায় কোম্পানিটি। ওয়েস্টার্ন বলেন, 'এই মুহূর্তে আমাদের মূল বাজার হলো অ্যারোস্পেস, প্রতিরক্ষা, টেলিযোগাযোগ এবং ডেটা খাত।'
তবে পৃথিবীতে ফিরে স্পেস ফোর্জকে বেশ কিছু বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ওয়েস্টার্ন বলেন, 'এখন পর্যন্ত আইনকানুন বা রেগুলেশনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এমন একটি ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছি যার কোনো অস্তিত্ব আগে ছিল না।'
তিনি জানান, ফোর্জস্টার-১ বানাতে মাত্র সাত সপ্তাহ লেগেছিল। কিন্তু এটি উৎক্ষেপণের লাইসেন্স পেতেই লেগেছে আড়াই বছর।
তাছাড়া মহাকাশে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নেই। তাই পণ্য পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পর তার ওপর কীভাবে কর বসানো হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ওয়েস্টার্ন বলেন, 'যা তৈরি হয়েছে তা যে দেশে নামছে, সেখানে তৈরি হয়নি। আবার অন্য কোনো দেশেও তৈরি হয়নি।'
করের বিষয়টি ছোট কোনো সমস্যা নয়। কারণ স্পেস ফোর্জ মহাকাশে যেসব উপাদান বানাতে চায়, তার মূল্য আকাশছোঁয়া।
ওয়েস্টার্ন জানান, পৃথিবীতে পাওয়া যায় এমন যৌগের উন্নত সংস্করণ তারা তৈরি করবেন। এগুলোর প্রতি কেজির দাম হতে পারে কয়েক কোটি ডলার। এ ছাড়া মহাকাশে 'শত শত নতুন উপাদানের সংমিশ্রণ' তৈরি করা সম্ভব, যা আগে শুধু তাত্ত্বিকভাবেই ভাবা হতো। সেগুলোর দাম হবে আরও অনেক বেশি।
পৃথিবীতে ফেরার চ্যালেঞ্জ
ডেলয়েটের বাজার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২২ শতাংশ বেড়েছে। এআই অবকাঠামোর ওপর ভর করে ২০২৭ সালের মধ্যে এটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক গবেষক জেসিকা ফ্রিক বলেন, 'এই ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য আসলেই সর্বোচ্চ মানের উপাদানের প্রয়োজন।' জেসিকা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে 'অ্যাস্ট্রাল মেটেরিয়ালস' নামে একটি মহাকাশ উৎপাদনকারী সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি স্পেস ফোর্জের সঙ্গে যুক্ত নন।
ফ্রিক বলেন, 'অতি-উচ্চমানের উপাদানের চাহিদা বাড়ছে।' কিন্তু মহাকাশ প্রস্তুতকারকদের আগে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, 'লো অরবিট বা নিম্ন কক্ষপথ থেকে নিয়মিত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য ফিরিয়ে আনা না পর্যন্ত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করা কঠিন হবে।'
ফ্রিক বিশ্বাস করেন, স্পেস-এক্স এর মতো বেসরকারি কোম্পানির কারণে মহাকাশে যাওয়া সহজ হচ্ছে।
তবে পৃথিবী থেকে মহাকাশে যাওয়ার তুলনায় ফিরে আসার ফ্লাইটের সংখ্যা অনেক কম। ফ্রিক বলেন, 'আমাদের পণ্য পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনাই এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ।'
তবে মহাকাশ শিল্পের বর্তমান গতি দেখে তিনি মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে হয়তো প্রতি মাসে ফিরতি ফ্লাইটের ব্যবস্থা হতে পারে।
স্পেস ফোর্জ একটি বিশেষ 'হিট শিল্ড' বা তাপরোধী বর্ম তৈরি করছে। এটি স্যাটেলাইট এবং উপাদানগুলোকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। এটি প্যারাসুটের মতো কাজ করবে এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে রক্ষা করবে।
ওয়েস্টার্ন বলেন, 'একে মেরি পপিন্সের ছাতার মহাকাশ সংস্করণ বলা যেতে পারে। এটি মূলত মহাকাশ-গ্রেডের একটি ছাতা। মিশনের শেষে এটি খুলে যাবে এবং কক্ষপথ থেকে ভাসতে ভাসতে মাটিতে নেমে আসবে।'
তিনি আশা করছেন, এই প্রযুক্তি মালামাল দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৃথিবীতে আনার পথ সুগম করবে।
বাধাগুলো অনেক উঁচুতে
ওয়েস্টার্ন জানান, স্পেস ফোর্জ যেসব পূর্ণাঙ্গ কারখানা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, সেগুলো বড় ওয়াশিং মেশিনের সমান হবে। ওজন হবে প্রায় ১০০ কেজি (২২০ পাউন্ড)। চালু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিটি কারখানা ১ কোটি সেমিকন্ডাক্টরের জন্য পর্যাপ্ত উপাদান তৈরি করতে পারবে।
ফোর্জস্টার-১ উৎক্ষেপণে খরচ হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড (৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার)। ওয়েস্টার্ন বলেন, এই খরচ ধরার পরও মহাকাশে ক্রিস্টালের 'বীজ' তৈরির খরচ পৃথিবীর প্রক্রিয়ার মতোই। তিনি যোগ করেন, মহাকাশে কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় সৌরশক্তি অফুরন্ত এবং 'ফ্রি'।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ডিন ম্যাথিউ ওয়েনজিয়ারল মহাকাশের ব্যবসা ও অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, মহাকাশে উৎপাদনের বাধাগুলো অনেক কঠিন।
তিনি বলেন, 'আগামী এক দশকে আমি এর ব্যাপক বাণিজ্যিক সাফল্য দেখছি না।' তবে তিনি এও বলেন, খরচ কমতে থাকায় মহাকাশে কিছু পণ্য উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়াটা 'অনিবার্য'।
তিনি বলেন, 'এই সম্ভাবনার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনিয়োগ করা সার্থক। মহাকাশে কাজ করে আমরা এমন কৌশল শিখতে পারি যা পৃথিবীতে বসে শেখা সম্ভব নয়।'
ওয়েস্টার্ন জানান, স্পেস ফোর্জ এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ডলার মূলধন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ন্যাটো ইনোভেশন ফান্ডও রয়েছে।
তিনি আশা করছেন, ফোর্জস্টার-১ মিশন কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হবে। এরপর কোম্পানিটি প্রথমবারের মতো মহাকাশে তাদের হিট শিল্ড পরীক্ষা করবে।
ওয়েস্টার্ন বলেন, 'আমার আশা, ১০ বছর পর আমার কাজটা সবার কাছে একঘেয়ে বা বোরিং মনে হবে। যেদিন কাউকে বলা হবে যে তার ফোন বা ল্যাপটপ মহাকাশে তৈরি চিপ দিয়ে বানানো হয়েছে এবং সে তাতে অবাক হবে না—সেদিন বুঝব আমরা সফল হয়েছি।'
