‘আব্রা-কাডাব্রা’ শব্দটির অর্থ কী?
'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' শব্দটি শুনলেই মনে হয়, কোনো জাদু হতে চলেছে। হয়তো কোনো কিছু বদলে যাবে, বা অন্তত কোনো জাদুর খেলা দেখানো হবে। এই শব্দটি নিজেই খুব অদ্ভুত, কিন্তু এখন এটি যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার এক বিশ্বজনীন সংকেত। বিশেষজ্ঞরা এর সঠিক উৎস নিয়ে বিতর্ক করলেও, শব্দটি যে অত্যন্ত প্রাচীন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
১৮০০ বছরেরও বেশি আগে, কুইন্টাস সেরেনাস স্যামোনিকাসের লেখায় প্রথম 'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' শব্দটি পাওয়া যায়। তবে তা কোনো জাদুর খেলার জন্য নয়, বরং জ্বরের এক জাদুকরী প্রতিকার হিসেবে। সেই যুগে অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না, তাই জ্বর ছিল এক মারাত্মক রোগ, যা থেকে মৃত্যুও হতে পারত। সেরেনাস ছিলেন রোমান সম্রাট গেটা এবং কারাকাল্লার গৃহশিক্ষক। এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার অবস্থানের কারণে তার কথার গুরুত্বও ছিল অনেক।
তার লেখা 'বুক অফ মেডিসিন' বইতে তিনি পরামর্শ দেন, একটি তাবিজের ভেতরে কাগজে শব্দটি লিখে অসুস্থ ব্যক্তির গলায় ঝুলিয়ে দিতে হবে। নিয়মটি ছিল, শব্দটি ওপর থেকে নিচে একটি ত্রিভুজের মতো করে লিখতে হবে এবং প্রতিটি লাইনে একটি করে অক্ষর কমাতে হবে।
এভাবে ১১ লাইনে শব্দটি শেষ হয়ে যাবে। সেরেনাসের বিশ্বাস ছিল, শব্দটি যেভাবে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেভাবেই রোগীর জ্বরও সেরে যাবে।
'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' শব্দের উৎস ও অর্থ
গবেষকরা দেখেছেন, তৃতীয় শতাব্দীর একটি গ্রিক প্যাপিরাসেও এই শব্দের ব্যবহার ছিল। গ্রিক জাদুতে বিশ্বাসীরা মনে করতেন, এভাবে ত্রিভুজের মতো করে শব্দ লেখা হলে তা অশুভ আত্মার নামকে দুর্বল করে দেয়, কারণ তাদের বিশ্বাসে, রোগবালাই হতো অশুভ আত্মার কারণে।
ভাষাবিদ এলিস গ্রাহাম বলেন, 'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' ছিল এমন একটি শব্দ, যা খারাপ জিনিসকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারত। এর উৎস নিয়ে অনেক মতামত প্রচলিত আছে:
কেউ কেউ মনে করেন, এটি হিব্রু শব্দগুচ্ছ 'এব্রাহ কে'দাব্রি' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'আমি বলার মাধ্যমে সৃষ্টি করি'। আবার অনেকের মতে, এর উৎস আরামাইক শব্দ 'আভরা গাভরা', যার অর্থ 'আমি মানুষ সৃষ্টি করব'—সৃষ্টির ষষ্ঠ দিনে ঈশ্বরের বলা কথা। অনেকে আবার হ্যারি পটারের 'আভাদা কেদাভরা' মন্ত্রের সাথে এর মিল খুঁজে পান। লেখিকা জে.কে. রাউলিং বলেছেন, এই আরামাইক শব্দটির অর্থ 'জিনিসটি ধ্বংস হয়ে যাক'। মধ্যযুগের ইতিহাসবিদ ডন স্কিমার মনে করেন, শব্দটি হিব্রু শব্দগুচ্ছ 'হা ব্রাখাহ দাবারা' থেকে আসতে পারে, যার অর্থ 'আশীর্বাদপ্রাপ্তের নাম'। তার মতে, এই ধারণাটি বেশ যৌক্তিক, কারণ প্রাচীনকাল থেকেই ঐশ্বরিক নামকে আরোগ্য ও সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী উৎস হিসেবে মনে করা হতো।
অসুস্থতা সারানোর জাদুকরী শব্দ
বহু শতাব্দী ধরে 'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' অসুস্থতা সারানোর জাদুকরী উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
ইংরেজ লেখক ড্যানিয়েল ডিফোর লেখায় জানা যায়, সপ্তদশ শতকে লন্ডনে প্লেগের সংক্রমণ ঠেকাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো। মানুষ ভাবত, প্লেগ যেন কোনো অশুভ আত্মার কাজ এবং তাবিজ ও বিশেষ শব্দ দিয়ে তাকে দূরে রাখা সম্ভব।
কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিকার হিসেবে শব্দটির কার্যকারিতা কমে আসে। ১৮০০-এর দশকের শুরুতে উইলিয়াম টমাস মনক্রিফের একটি মঞ্চনাটকে এটিকে জাদুকরদের উচ্চারিত একটি শব্দ হিসেবে দেখানো হয়। বিংশ শতাব্দীতে এর একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যবহার দেখা যায় অ্যালিস্টার ক্রাউলির প্রতিষ্ঠিত 'থেলেমা' ধর্মে।
জাদুর মঞ্চে আগমন
ইতিহাসবিদ গ্রাহাম বলেন, আধুনিক চিকিৎসার উন্নতির আগে পর্যন্তই মানুষ জাদুর ওপর নির্ভর করত। তিনি বলেন, 'এখন আমাদের কাছে আরও ভালো ওষুধ আছে।'
আর একারণেই 'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' এখন মঞ্চের জাদুকরদের কৌশল আর ভেলকিবাজির অংশ হয়ে গেছে।
'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' শব্দের শক্তি যদি এখনো কিছু থেকে থাকে, তবে তা এর রহস্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। গ্রাহাম বলেন, 'একটি জাদুকরী শব্দ জাদুকরকে ক্ষমতা দেয়, কারণ বাইরের লোকেরা এর অর্থ জানে না। এটি অন্যদের চোখে জাদুকরকে শক্তিশালী করে তোলে।'
তাই 'অ্যাব্রাকাড্যাবরা' শব্দটি যদি অর্থহীন মনে হয়, তবে সেটাই হয়তো এর আসল উদ্দেশ্য। কারণ শব্দটি রহস্যময় না হলে, এর জাদুও হয়তো কিছুটা কমে যেত
