এটি চীনের যুদ্ধ নয়, তবে বহু বছর আগেই প্রস্তুত হওয়া শুরু করেছিল বেইজিং
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট বিশ্বের শীর্ষ তেল আমদানিকারক দেশ চীনকে কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে। তবে বেইজিং বহু বছর ধরেই এই ধরনের সংকটের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।
চীন ক্রমবর্ধমান হারে বিশাল পরিমাণ তেল মজুত করেছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দেশটি এতটাই জোর দিয়েছে যে সেখানে পরিশোধিত তেল, ডিজেল ও পেট্রলের চাহিদা দিন দিন কমছে। এছাড়া কারখানার বিশাল উৎপাদন বজায় রাখতে দেশটি প্রযুক্তির সাহায্যে বিদেশের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতাও কমিয়ে এনেছে।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পখাতকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের ভিত্তি হিসেবে দেখে আসছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পর থেকে তারা এই নীতিকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেছে। স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীন তাদের নীতিগুলোকে দ্বিগুণ শক্তিশালী করেছে, যার ফলে সম্পদ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ওপর তাদের আধিপত্যকে আরও মজবুত হয়েছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক হেইওয়াই তাং বলেন, 'আপনারা এখন অনেক বেশি ওপর থেকে নির্ধারিত শিল্প নীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেখছেন। চীন এমন কিছু কৌশলগত খাতকে শক্তিশালী করতে চায় যাতে পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।'
জ্বালানি ছিল এই পরিকল্পনার প্রধান চাবিকাঠি।
এক দশক আগেও বিশ্বের জ্বালানি তেলচালিত গাড়ির বৃহত্তম বাজার ছিল চীন। আজ এটি ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক যানবাহনের শীর্ষ বাজারে পরিণত হয়েছে। চীন আগে বিদেশ থেকে আনা পেট্রোকেমিক্যালের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল। এই তেলজাতীয় কাঁচামালগুলো প্লাস্টিক, ধাতু, রাবার এবং কারখানার বিভিন্ন পণ্য তৈরির প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখন দেশটি মিথানল এবং কৃত্রিম অ্যামোনিয়ার মতো রাসায়নিক তৈরি করতে মূলত নিজেদের উৎপাদিত কয়লা ব্যবহার করছে। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগই এই অগ্রগতির মূলে কাজ করেছে।
এশিয়ার তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত বন্ধ থাকলেও, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় চীন এখন পর্যন্ত অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
চীন এখন তার অনেক গাড়ি ও ট্রেন বিদ্যুতের সাহায্যে চালাচ্ছে, যা তেলের ওপর দেশটির নির্ভরশীলতা ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল বা বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য উৎপাদনে চীন তেলের পরিবর্তে কয়লার ব্যবহারের প্রযুক্তি রপ্ত করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি এখন বেইজিংকে তেলের বিকল্প হিসেবে কারখানার কাঁচামাল জোগাতে সাহায্য করছে।
তেল ও অন্যান্য জ্বালানির তীব্র সংকটের মুখে পড়া ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন গত মাসে চীনের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন প্রস্তুত রয়েছে।
বিদেশি জ্বালানি ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। এই শতকের শুরুর দিকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ঝুঁকি নিয়ে বেইজিংয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরণের দুশ্চিন্তা ছিল। সেই উদ্বেগ থেকেই ২০০৪ সালে চীন একটি জরুরি পেট্রোলিয়াম মজুত গড়ে তোলে এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই মজুত বাড়ানোর কাজ আরও দ্রুততর করা হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে চীন যখন বিশ্বের শিল্পোৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, তখন রাসায়নিক সরবরাহের জন্য তাদের ডু-পন্ট, শেল এবং বিএএসএফ-এর মতো বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক রাসায়নিক সরবরাহের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে চীনা কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বিশ্বের মোট পলিয়েস্টার ও নাইলনের তিন-চতুর্থাংশই চীনে তৈরি হয়।
চীন এখনও বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশ এবং দেশটির প্রয়োজনীয় তেলের তিন-চতুর্থাংশই বিদেশ থেকে আসে। বেইজিং তাদের প্রকৃত মজুত সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ না করলেও সরকারি হিসেবে ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় অপরিশোধিত তেল আমদানি ৪.৪ শতাংশ এবং ব্যবহার ৩.৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগের সুফল এখন পেতে শুরু করেছে চীন। দেশটিতে টানা দুই বছর ধরে পরিশোধিত তেল, পেট্রল এবং ডিজেলের চাহিদা কমছে। এর ফলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, চীনে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
একই সময়ে চীন তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও মজবুত করতে পেট্রোকেমিক্যাল বা রাসায়নিক শিল্পে তেলের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। জার্মান রাসায়নিক কোম্পানি বিএএসএফ-এর চীনে নিযুক্ত সাবেক প্রতিনিধি জোয়ের্গ উটকে জানান, সরকারের বিশাল বিনিয়োগ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ফলে দেশটির শিল্পখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনকালে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে এই স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বর্তমানে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অংশীদার উটকে বলেন, 'ট্রাম্প যা কিছুই করেন না কেন, তা বেইজিংকে আরও বেশি স্বনির্ভর হতে উৎসাহিত করে।'
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক ইস্যুতে চীনের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিলেন, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত লড়াই শুরু হয়। ট্রাম্পের এই মারমুখী অবস্থান বেইজিংয়ের জন্য একটি বিশেষ সতর্কবার্তা ছিল।
চীনের এই রণকৌশল পরিবর্তনের সংকেত আসতে শুরু করে ২০১৯ সালেই। তৎকালীন প্রিমিয়ার লি খ্যছিয়াং সমুদ্রপথে আসা তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রাসায়নিক পণ্য তৈরিতে কয়লা ব্যবহারের আহ্বান জানান। এটি ছিল পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কয়লা ব্যবহারের হার কমিয়ে আনার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য থেকে এক বড় বিচ্যুতি।
২০২০ সালের শেষ দিকে করোনা অতিমারি যখন বিশ্ব বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলে বড় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল, তখন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা প্রণয়ন করেন।
কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী তাত্ত্বিক সাময়িকী 'কিউশি'-তে প্রকাশিত বার্তায় চীনা শিল্পখাতকে কোমর বেঁধে নামার আহ্বান জানানো হয়। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় বিদেশের চেয়ে দ্রুত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে স্বনির্ভর হতে, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ব্যাহত হলেও চীন নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
জ্বালানি ও বায়ুমান বিষয়ক গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লরি মিলিভির্তা দীর্ঘ সময় ধরে চীনে কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের প্রসার পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, 'ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল এক বিশাল ধাক্কা, যা চীনের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দেয় এবং তাদের পুরনো ভয়গুলোকে আবারও উসকে দেয়।'
মিলিভির্তা আরও যোগ করেন, 'শি জিনপিং নিজেই সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সরব হয়েছিলেন। সরকারের এই সবুজ সংকেত মূলত তেলের বদলে কয়লার সাহায্যে রাসায়নিক কাঁচামাল তৈরির কারখানাগুলোর জন্য এক অভাবনীয় জোয়ার নিয়ে আসে।' শীর্ষ নেতৃত্বের এই অনড় অবস্থানের কারণেই দেশটির শিল্পখাতে তেল বাদ দিয়ে কয়লা ব্যবহারের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে।
২০২০ সালে চীন রাসায়নিক পণ্য তৈরিতে ১৫ কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা ব্যবহার করত। ২০২৪ সাল নাগাদ এই ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৬০ লাখ টনে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট কয়লা ব্যবহারের (২৩ কোটি টন) রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
চীনা কর্মকর্তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার আগ পর্যন্ত কয়লার এই ব্যবহার একটি সাময়িক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পেট্রোকেমিক্যাল তৈরির প্রযুক্তিতেও বড় বিনিয়োগ করেছে। তবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকট ও উচ্চমূল্যের সময়ে তেলের বিকল্প হিসেবে কয়লার ব্যবহার চীনের জন্য বড় সুফল নিয়ে আসছে।
নাইট্রোজেন সারের কথাই ধরা যাক; চীন বিশ্বের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে, যার ৮০ শতাংশই তেলের পরিবর্তে কয়লা দিয়ে তৈরি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারের প্রধান কাঁচামাল ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক দাম ৪০ শতাংশের বেশি বাড়লেও চীনে উৎপাদিত ইউরিয়ার দাম বৈশ্বিক দামের অর্ধেকেরও কম রয়েছে।
জার্মান থিংকট্যাংক মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিশ্লেষক জোহানা ক্রেবস বলেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আগে থেকেই চীন এই খাতে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল। তার মতে, চীনারা বর্তমান এই পরিস্থিতিকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবেই দেখবে।
