বাস্তবায়িত হয়নি সরকারের প্রতিশ্রুতি: ঈদের আগে এসি বাসের ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যের শিকার যাত্রীরা
সরকার বারবার ঈদুল আজহার আগে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দিলেও ঘরমুখী মানুষ এখন বিভিন্ন রুটে চরম হয়রানি, ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় ও নিরাপত্তা ঝুঁকির শিকার হচ্ছে।
আগামী ২৮ মে উদযাপিত হতে যাচ্ছে ঈদ। এ উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষ এরইমধ্যে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, গলাকাটা দরে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের এসি বাসের টিকিট কাটতে হচ্ছে তাদের।
গত ৯ এপ্রিল সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছিলেন, শীঘ্রই এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করবে সরকার। এরপর ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ঈদের আগে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে।
তবে কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে যাত্রীরা, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের রুটে চলাচলকারী তথাকথিত 'স্লিপার' বা 'স্যুইট ক্লাস' বাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের 'পরিবহন নৈরাজ্যের' শিকার হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সরেজমিনে গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে টিবিএস দেখেছে, পরিবহন অপারেটররা ঢাকা থেকে রংপুরগামী পাটগ্রাম এক্সপ্রেসের একমুখী 'স্যুইট ক্লাস' টিকিটের জন্য ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছে।
একই রুটে চলাচলকারী বুড়িমারী এক্সপ্রেসেও একই শ্রেণির বাসের জন্য সমপরিমাণ ভাড়া রাখা হচ্ছে।
এই স্লিপার বাসগুলো ভারত থেকে আমদানি করা সিঙ্গেল-ডেকার বাসের চ্যাসিসের ওপর বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা মডিফাইড ডাবল-ডেকার কাঠামো। এসব বাসের নিচের অংশে আসন রয়েছে, আর উপরের অংশে শোয়ার জন্য বার্থ বসানো হয়েছে।
ভেতরে জায়গা খুব কম থাকায় এবং যাত্রীদের জন্য অনিরাপদ হওয়ায় পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা এসব বাসকে 'কফিন ক্লাস' বা 'মুরগির খোপ' নামেও ডেকে থাকেন।
পরিবহন বিশেষঙ্গ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মো. হাদিউজ্জামান এ ধরনের বাসকে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি বলে উল্লেখ করেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, সিঙ্গেল ডেকার চ্যাসিসের ওপর এভাবে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস তৈরি করা সরাসরি একটি 'ক্রিমিনাল অফেন্স'। কারণ এতে বাসের সেন্টার অভ গ্র্যাভিটি (ভারকেন্দ্র) নষ্ট হয়ে যায়, ফলে মহাসড়কে চলাচলের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান আরও বলেন, 'চ্যাসিস মূলত সিঙ্গেল ডেকারের জন্য ডিজাইন করা, সেটিকে লোকাল ওয়ার্কশপে পরিবর্তন করে স্লিপার বাস বানানো সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিংবিরোধী।'
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত মডেলের বাইরে তৈরি এসব বাস কীভাবে রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট পাচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
এ ধরনের একটি স্লিপার বাসে সম্প্রতি ঢাকা থেকে লালমনিরহাটে গেছেন আসপিয়া স্মরণী (৩০)। তিনি টিবিএসকে বলেন, অতিরিক্ত ঝাঁকি ও বাসের বাজে সাসপেনশনের কারণে তিনি পুরো রাস্তায় এক সেকেন্ডের জন্যও ঘুমাতে পারেননি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক পরিবহন আইনে স্লিপার বাসের কোনো আইনি স্বীকৃতি বা সংজ্ঞা নেই। তার অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব স্লিপার বাস কোনো প্রকার নিয়ম-নীতি ছাড়াই চলাচল করছে।
ঈদের আগে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'ঈদযাত্রায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি।'
মোজাম্মেল হক আরও অভিযোগ করেন, সরকারি পরিবহন বিষয়ক বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী ফোরাম বা কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধি থাকলেও যাত্রী কল্যাণ সমিতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। দিনশেষে এমন সব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় যা যাত্রীদের স্বার্থ নয়, বরং পরিবহন মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করে।
গাবতলী টার্মিনালে কাউন্টারগুলোতেহাঁকানো হচ্ছে অতিরিক্ত দাম, অর্ধেক দূরত্ব গেলেও নেওয়া হচ্ছে পুরো যাত্রাপথের ভাড়া। আবার 'ঈদ বোনাসের' নামেও বাড়তি ভাড়া আদায় করছে কিছু পরিবহন অপারেটর।
টেকনিক্যাল মোড়ে নাবিল পরিবহনের টিকেট কাটতে এসে ভোগান্তিতে পড়েন স্নাতক শিক্ষার্থী হিমেল। তিনি জানালেন, সাধারণ যাত্রীদের দরকষাকষির তেমন কোনো সুযোগ নেই। বিআরটিএর হালনাগাদ করা ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, এই রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৯৯৭ টাকা। অথচ কাউন্টার ম্যানেজার তার কাছে দুটি টিকিটের জন্য ২ হাজার ৪৫০ টাকা দাবি করেন।
হিমেল বলেন, 'আমি রংপুরে নামলেও আমার কাছে দিনাজপুর কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। আবার ঈদ বোনাসের নামেও অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হচ্ছে।'
একই চিত্র দেখা গেছে আনিতা পরিবহনেও। ঢাকা-জলঢাকা রুটে একটি নন-এসি বাসের অগ্রিম টিকেটের জন্য পরিবহনটির সুপারভাইজার রাশিদুল ১ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করেন, অথচ সরকার-নির্ধারিত ভাড়া ১ হাজার ১০৮ টাকা।
এদিকে গাবতলী টার্মিনালে দায়িত্বরত বিআরটিএ কর্মকর্তারা দাবি করেন, এখন পর্যন্ত তারা বড় ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি।
টার্মিনালে একটি অস্থায়ী ভিজিল্যান্স ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিআরটিএর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া টিবিসকে বলেন, ২৪ মে থেকে ঈদযাত্রার চাপ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, 'গাবতলী, মহাখালীসহ সব গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালে আমাদের ভিজেল্যান্স টিম কাজ করছে। ৬ জুন পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম চলবে ।'
তবে সায়েদাবাদ ও আরামবাগ টার্মিনালে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার অনেক অপারেটর দাবি করেছেন, তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা মেনেই বাস পরিচালনা করছেন।
পরিবহন কর্মকর্তারা বলেন, এখন পর্যন্ত যাত্রীদের চাপ কম, তবে ঈদের তারিখ যত ঘনিয়ে আসবে, চাহিদা তত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
