ট্রাম্পের দাবির পর পাকিস্তানের তেল খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে

পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কূটনীতিক জানিয়েছেন, দেশটির তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো "শক্তিশালী আগ্রহ" দেখাচ্ছে। এর আগে গত মাসের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করে পাকিস্তানে "বৃহৎ তেলের মজুদ" থাকার দাবি করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি শিল্প সংশ্লিষ্টদের বিস্মিত করেছিলেন।
পাকিস্তানের জ্বালানিমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে মার্কিন দুতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নাতালি এ. বেকারের সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এ সময় জ্বালানি খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। পারভেজ মালিক জানান, তেল অনুসন্ধানের নতুন ব্লক নিয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নাতালি বেকার বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই পাকিস্তানের তেল, গ্যাস ও খনিজ খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ জোরালোভাবে বাড়ছে।" তিনি বলেন, মার্কিন দূতাবাস সরাসরি ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপনে "সক্রিয় ভূমিকা" নেবে।
তবে ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
ট্রাম্পের মন্তব্যে চমকে ওঠে শিল্পখাত
গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের এক পোস্টে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানে রয়েছে "বিশাল তেল মজুত"। এই দাবি অভিজ্ঞ তেল কোম্পানিগুলোকেও অবাক করেছে। বিদ্যমান অনুমানের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই, বরং দেশটির জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য টানাপোড়েনও প্রকট হচ্ছে। ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনছে বলে নয়াদিল্লির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দেন, পাকিস্তান একদিন প্রতিবেশী ভারতকেও তেল বিক্রি করতে পারে।
পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী ও অভিজ্ঞ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মইন রেজা খান বলেন, "এটি রাজনৈতিক বক্তব্য। যদি সত্যিই পাকিস্তানে বিশাল তেলভাণ্ডার থাকত, তাহলে এত বিদেশি কোম্পানি কেন দেশ ছেড়ে চলে যেত?"
হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের পোস্টের বাইরে এবিষয়ে অন্য কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
অনুমান ও বাস্তবতা
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০১৩ সালের এক পূর্বাভাস উল্লেখ করে থাকে, যেখানে বলা হয়েছিল দেশটিতে ৯.১ বিলিয়ন ব্যারেল উত্তোলনযোগ্য শেল অয়েল থাকতে পারে। তবে করাচির আরিফ হাবিব লিমিটেডের বিশ্লেষক ইকবাল জাওয়াদ মনে করেন, প্রকৃত মজুত হতে পারে অনেক কম—মাত্র প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল।
তুলনামূলকভাবে, সৌদি আরব, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে উত্তোলনযোগ্য মজুত শত শত কোটি ব্যারেল। পাকিস্তানে গত এক দশকে কোনো বড় তেলক্ষেত্র-ও আবিষ্কার হয়নি। সর্বশেষ আবিষ্কৃত বড় দুটি তেলক্ষেত্র হলো ২০০৯ সালে নাশপা (অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির নেতৃত্বে) এবং ২০১১ সালে মাকোরি ইস্ট (হাঙ্গেরির এমওএল গ্রুপের অংশগ্রহণে)।
বিদেশি কোম্পানির প্রস্থান
এমওএল গ্রুপ ১৯৯৯ সাল থেকে পাকিস্তানে কাজ করছে। তবে দেশটির জ্বালানিখাতে বিদেশি কোম্পানির সংখ্যা দ্রুত কমছে। গত বছর কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চার দশকের বেশি সময় পর পাকিস্তান ছাড়ার ঘোষণা দেয়। টোটালএনার্জিসও তাদের শেয়ার বিক্রি করে। ২০২৩ সালে ৭৫ বছর পর পাকিস্তান থেকে বিদায় নেয় শেল।
২০১৯ সালে ইতালির এনি স্পা ও এক্সন মবিল করপোরেশন আরব সাগরে অফশোর সম্ভাবনা যাচাই করতে পাকিস্তানি অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ খনন চালায়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য মেলেনি।
নতুন দরপত্র আহ্বান
এ বছর পাকিস্তান সরকার ৪০টি অফশোর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে, যার মধ্যে সিন্ধু অববাহিকাও রয়েছে। অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আনাস ফারুক। তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। অক্টোবরে এসব ব্লকের জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা।
দেশীয় তেল উৎপাদন বাড়াতে পারলে পাকিস্তান সরকারের জন্য তা হবে বড় স্বস্তি। আন্তর্জাতিক এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকে দেশটিতে তেলের উৎপাদন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে পাকিস্তানকে প্রতিবছর প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ করে তেল আমদানি করতে হয়, যা দেশটির মোট আমদানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশন অব কানাডার সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, "পাকিস্তানের তেল মজুত আবিষ্কারে আগ্রহীরা বড় ঝুঁকির মুখে পড়বেন। সেখানে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অভাব আছে, পাশাপাশি নিরাপত্তা সমস্যাও গভীর।"
তিনি যোগ করেন, "যদি এসব বাধা সহজে অতিক্রম করা যেত, তবে পাকিস্তান এতদিনে নিজস্ব মজুত কাজে লাগাতে পারত এবং বহুজাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ আরও বেশি দেখা যেত।"