ঈদের সাজগোজ থেকে খাবার; আগের রাতে মায়ের জাদুতেই ঈদ আনন্দ পায় পূর্ণতা
শনিবার সন্ধ্যা। কেনজা ফোরাতি তার দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে রমজান মাসের দিনক্ষণ লেখা ক্যালেন্ডারের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মাসখানেক আগেই তাদের ব্রুকলিনের বাড়ির দেয়ালে এটি ঝুলিয়ে রাখেন তারা।
'ইয়াল্লাহ, উলটে দাও', বললেন ফোরাতি। শিশুরা মিলে ক্যালেন্ডার উলটে দেখল, তাতে লেখা— 'ঈদ মোবারক। মোহিয়েলদিন-ফোরাতি পরিবার।'
সূর্য অস্ত গেছে, আকাশে দেখা গেছে শাওয়াল মাসের ঈদের চাঁদ। নিশ্চিত হওয়া গেল—আগামীকাল ঈদ!
পেশায় মডেল ও 'ওসেই' ব্র্যান্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফোরাতি, ধীরে ধীরে রমজান ও ঈদে ঘর সাজানোর নতুন অভ্যাসের সাথে মানিয়ে নিচ্ছেন। তার সন্তানরা বড় হচ্ছে, ধর্ম নিয়ে তাদের আগ্রহও বাড়ছে।
৩৯ বছর বয়সী ফোরাতি বড় হয়েছেন তিউনিসে। সেখানে ঈদ ছিল জাঁকজমকে পূর্ণ। ঈদের আগের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ানো, আতশবাজির আলোয় রাস্তাগুলো ঝলমল করা—এসব স্মৃতি আজও তার মনে গেঁথে আছে।




এখন তিনি চান, তার সন্তানদেরও সেই অভিজ্ঞতা হোক। 'আমি এভাবেই বড় হয়েছি, তাই চাই আমার সন্তানদেরও আমাদের শৈশবের একটু স্বাদ দিতে,' বললেন ফোরাতি। তিনি নানা মজার উপায়ে তার সন্তানদের ইসলামের শিক্ষা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।
এসব যখন বলছিলেন তখন পাশেই দুষ্টমি করে কুস্তি লড়ছিল তার দুই সন্তান। হাসতে হাসতে তাদের লড়াই থামালেন। এরপর নিয়ে গেলেন উপরের ঘরে। সকালবেলার ঈদের নামাজের জন্য নতুন পোশাক রাখা সেখানে
ছয় বছরের ইদ্রিসের জন্য তিনি বের করে আনলেন সাদা জোব্বা—তিউনিসিয়ার ঐতিহ্যবাহী একটি পোশাক, সঙ্গে লাল চেচিয়া, ছোট ব্রিমবিহীন টুপি। আট বছরের ডোরাকে বলা হলো দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে—সোনালি বেল্টসহ বেগুনি জোব্বা কিংবা কালো ফিলিস্তিনি থোব।
ডোরা আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, 'আমি বেগুনি ড্রেসটাই চাই! এটা চকচকে, আর তাতে অনেক গয়না আছে!'
রহমত ও আত্মসংযমের এক মাস পর ঈদুল ফিতর আসে মুসলিমদের জন্য খুশির বার্তা নিয়ে। নতুন জামা পরে উৎসবে সামিল হওয়া, মায়ের হাতের বিশেষ খাবার কিংবা বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ—এগুলো সবই ঈদ আনন্দের অংশ। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই সম্ভব হতো না আমাদের মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া—ঈদের আগের দিন দিন-রাত এক করে তারা আমাদের জন্য সব কিছু প্রস্তুত করেন, যেন আমরা নিশ্চিন্তে উৎসব উদযাপন করতে পারি।
নিউ ইয়র্কে প্রায় ৮ লাখ মুসলিম পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের প্রত্যেক মায়েরা সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ঈদ আনন্দকে রাঙিয়ে তুলতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। শৈশবের পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রস্তুতির কোনো কমতি রাখেন না।
১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের সন্দীপ দ্বীপে বড় হয়েছেন মাহিমা বেগম। তাদের ঈদ শুরু হতো এক উৎসবমুখর সকালে, পাঁচ ভাই-বোন মিলে দ্রুত চলে যেতেন মেলায়। রঙিন চুড়ি ও নানারকম মিষ্টির খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন সারাদিন। এরপর বাড়ি ফিরে তাদের জন্য অপেক্ষা করত মায়ের হাতে তৈরি ঈদের বিশেষ খাবার। তাদের মা পুরো রাত জেগে এগুলো প্রস্তুত করতেন।
'আমরা কিছুই করতাম না,' মুচকি হেসে বললেন মাহিমা বেগম। 'সব কিছুই মা করতেন।'
মায়ের সেই দায়িত্ব এখন ৪৯ বছর বয়সী মাহিমা বেগমের কাঁধে। প্রতি বছর, তিনি তার ব্রুকলিনের কেনসিংটন এলাকার বাড়িতে ঈদের বিশেষ খাবারসহ প্রায় ৪০ জন আত্মীয়কে আপ্যায়ন করেন । এই কাজ মোটেই সহজ নয় বললেন তিনি।
'প্রথমে, আমি ভাবি, আমার সন্তানরা কী পছন্দ করে। আমি সেই ধরনের খাবারই তৈরি করি', বলেন মাহিমা বেগম।
ঈদের দিন ভোর ৪টা থেকে রান্না শুরু করেন তিনি। গরুর গোশতের বিরিয়ানি, খাসির কোরমা, এবং তার নিজের বিশেষ ডিশ—চিকেন ঝাল ফ্রাইসহ নানা পদের আয়োজন করেন। তার মেয়ে শম্পা কবিরের বয়স যখন দুই বছর, তখন প্রথম চিকেন ঝাল ফ্রাইয়ের এই রেসিপিটি তৈরি করেছিলেন। এরপর থেকে প্রতি ঈদেই তৈরি করেন।
২৯ বছর বয়সী শম্পা কবির অবশ্য এখন একজন ফুড কনটেন্ট ক্রিয়েটর। মাকে দেখেই রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে তার। বড় হওয়ার পর রান্নায় মাকে যতটা পারেন সাহায্য করেন। গত কয়েক বছর ধরে ইদে তিনি একটি বিশেষ ডেজার্ট তৈরি করেন, যার নাম 'রসমালাই কেক'। এটি এক ধরনের আলমন্ড ক্রাস্টেড স্পঞ্জ কেক, অনেকটা ট্রেস লেচেসের মতো—মসলাযুক্ত দুধ দিয়ে তৈরি এবং হালকা হুইপড ক্রিম দিয়ে সজ্জিত।
শম্পা কবির বলেন, 'আমি চাই, উনি বুঝতে পারুক যে, তাকে (মা) মূল্যায়ন করা হচ্ছে'।
'উনি সারাজীবন ধরে এই কাজগুলো করছেন। আমি চাই উনি দেখুক এবং বুঝুক যে, তার এই কাজ খুবই প্রশংসনীয়', যোগ করেন শম্পা কবির।
ব্রঙ্কসের হাই ব্রিজ এলাকায়, দুই মেয়ে এবং পুত্রবধূকে নিয়ে ঈদের খাবার প্রস্তুত করছিলেন ৫২ বছর বয়সী রামাতুলায়ে দিয়ালো। পেশায় তিনি নার্স। সেনেগালি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এবারের বিশেষ পদ ছিল থিবো ইউয়াপ—একটি এক পাত্রে তৈরি গরুর মাংস ও চালের মিশ্রণ।




রাত ১টার কিছু আগে, মেরিনেট করা গরুর মাংস একটি বিশাল পাত্রে স্থানান্তরিত করেন দিয়ালো। পাত্রটি এত বড় যে, চুলার দুইটি বার্নারের প্রয়োজন হয় এটি রান্না করতে। এরপর, তিনি অন্য একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার—পেঁয়াজ সস দিয়ে তৈরি ভারমিসেলি বা ইয়াসা তৈরি করতে মনোযোগ দেন। এসময়, ফু্লানি ভাষায় এক মেয়েকে কিচেনের পাশে থাকা পানির পাত্র আনার জন্য নির্দেশ দেন।
এরপর তার মেয়েরা রান্নাঘর থেকে সরে গিয়ে খাবার টেবিল সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। টেবিলের ওপর বিছানো হয় মরক্কো ভ্রমণ থেকে কেনা নতুন চাদর (টেবিলক্লথ)। পাশাপাশি, বিছানার চাদর পরিবর্তন ও পর্দা পরিষ্কার করে তারা। মা দিয়ালোকে দেখেই এসব কাজ শিখেছেন তারা। তাদের মা সেনেগালের থিয়েসে থাকাকালীনও একই নিয়ম পালন করতেন।
'একটা প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, ঈদের দিন সব কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে,' বলছিলেন ২০০৬ সালে পরিবার নিয়ে নিউইয়র্কে আসা দিয়ালো। 'কোনো নোংরা জামাকাপড় থাকা যাবে না, কিছুই অপরিষ্কার থাকবে না। দিনটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, এতটাই পবিত্র যে, সব কিছু পরিপাটি রাখাটা একরকম রীতি।'
তিনি চান তার মেয়েরাও যেন ঈদের গুরুত্ব বোঝে। 'এখানে থাকা সহজ নয়। অনেকে পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে যায়,' বলেন দিয়ালো।
উনার এই চেষ্টা অবশ্য বৃথা যায়নি। বড় মেয়ে সাফিয়াতু দিয়ালো (২৮) জানালেন, ঈদে তার সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো ঐতিহ্যবাহী ফুলানি পোশাকের জন্য কাপড় নির্বাচন ও তা দর্জির হাতে তৈরি করানো। সাফিয়াতু বলেন, 'আমি কখনো কখনো কল্পনা করি, আফ্রিকায় ফিরে গিয়ে প্রতিদিন আফ্রিকান পোশাক পরব'।
এদিকে, আফগান শরণার্থী পরিবারের মেয়ে ইয়েলদা আলি (৩৯) ভাবছেন, কীভাবে তার ১৫ মাস বয়সী মেয়ে ইমানকে নিজ সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। কানাডার এডমন্টনে বড় হওয়া ইয়েলদা ছোটবেলায় ঈদ কাটিয়েছেন আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘুরে। কিন্তু নিউইয়র্কে ১৬ বছর ধরে থাকার পর, তিনি এমন কোনো পরিবার বা ঘনিষ্ঠজন পাননি যাদের বাড়ি গিয়ে সেই পুরোনো আনন্দকে ফিরে পাওয়া যায়, উপভোগ করা যায়। তার পরিবার এখনো কানাডাতেই থাকে। তবে এখন মা হওয়ার পর, তিনি নিজের বাড়িতেই স্বামী অ্যান্থনি মেহিয়ার সঙ্গে সেই পুরোনো ঐতিহ্য নতুনভাবে লালন করার চেষ্টা করছেন।
ব্রুকলিনের বেডফোর্ড-স্টাইভেস্যান্ট অঞ্চলের ডিজে ইয়েলদা বলেন, 'আমি মনে করি, ঐতিহ্য আমাদের শেকড়ে বেঁধে রাখে'। 'আমরা এখনো আমাদের ভাষার সুবিধা পাই, আমাদের রেসিপি, গান, সুর—এসব এখনো আমাদের আছে। আমার কাছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটাই আমাদের অস্তিত্ব। যদি আমরা আমাদের সংস্কৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে টিকিয়ে না রাখি, ইচ্ছাকৃতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে না পৌঁছাই, তাহলে তা হারিয়ে যাবে। প্রবাসে কত কিছুই না হারিয়ে যায়—আমরা তা ঘটতে দেখেছি।'
প্রতি ঈদে, ইয়েলদা পরিকল্পনা করেন, তার মায়ের দিক থেকে পাওয়া কোনো নতুন আফগানি রেসিপি রপ্ত করবেন। এসব রেসিপি কোথাও লিখে রাখা নেই, তাই তিনি চান না এগুলো হারিয়ে যাক। এজন্য এবার তিনি শিখেছেন আফগান পাস্তা তৈরির কৌশল, যা গরুর কিমার সঙ্গে রান্না করে দই ও শুকনো পুদিনা পাতা দিয়ে পরিবেশন করা হয়।



তার স্বামী ডোমিনিকান বংশোদ্ভুত অ্যান্থনি মেহিয়াও, আফগান খাবার রান্না করা শিখতে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অ্যান্থনি তখন রান্নাঘরে পেঁয়াজ ভাজছিলেন, আর পাশের ঘরে ইয়েলদা তাদের মেয়ে ইমানের ফুলের নকশা করা ঈদের পোশাক ইস্ত্রি করছিলেন। আর ঘরে বাজছিল প্রাণবন্ত আফগান লোকসংগীত, গান শুনে শুনে নাচছিল ছোট্ট ইমান।
ইয়েলদা ও তার পরিবারের ইচ্ছে ছিল ঈদ উপলক্ষ্যে হারবার্ট ভন কিং পার্কে এক ধরনের মেলা বা পিকনিক আয়োজন করার। সেখানে থাকবে আফগান পাস্তা ও ঐতিহ্যবাহী কিছু মিষ্টান্ন। আফগান সম্প্রদায়ে মেলার প্রচলন বেশ সাধারণ, যদিও সাধারণত এসব মেলা বড় পরিসরে হয়। তবে নিউইয়র্কে ইয়েলদা আলি তার নতুন পরিবার নিয়ে আপাতত ছোট পরিসরেই মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
'সবকিছু মানের ব্যাপার, সংখ্যার নয়, তাই তো?', আত্মবিশ্বাসী এক হাসি দিয়ে বললেন ইয়েলদা।
অনুবাদ: সাকাব নাহিয়ান শ্রাবন