নতুন যোদ্ধা খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে ইউক্রেন

ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তা ওলেকসান্দ্র সিকালচুকের জন্য এটি ছিল একটি রুটিন দায়িত্ব। ফ্রন্টলাইন থেকে অনেক দূরে, ৩৯ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা নতুন নিয়োগ পাওয়া কিছু সেনা সদস্যকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
তবে মাঝরাতে পোলটাভা অঞ্চলে একটি পেট্রোল স্টেশনে থামার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এক ব্যক্তি হঠাৎ অস্ত্র হাতে সামনে এসে সিকালচুকের বন্দুক চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। এরপর ওই ব্যক্তি গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে এবং এক সেনাকে নিয়ে পালিয়ে যায়।
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হওয়া এই ঘটনার পর থেকে ইউক্রেনের সেনা নিয়োগ কর্মকর্তাদের ওপর একের পর একে আরও বেশ কয়েকটি হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এর জন্য রাশিয়ার অনুপ্রবেশকারীদের দায়ী করলেও, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা মনে করছেন, এই হামলাগুলো দেশীয় বিদ্রোহীদের কাজ।
নিহত সেনা কর্মকর্তার সহকর্মী রোমান ইস্তোমিন বলেন, 'এটি রাশিয়ার কাজ হলে ভালো হতো, কিন্তু হয়তো বিষয়টি আরও ভয়ংকর কিছু।'
এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইউক্রেনের সেনা নিয়োগ প্রক্রিয়া নানা সংকটের মুখে। পূর্ব ফ্রন্টে যুদ্ধ আপাতত ধীরগতির হলেও রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা দেখে অনেকে সেনাবাহিনীতে যোগ না দিয়ে আত্মগোপন করছেন বা দেশ ছাড়ছেন। ফলে নিয়োগ কর্মকর্তারা কঠোরভাবে নতুন সেনা সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা আবার রাশিয়ার প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
৪৬তম ব্রিগেডের এক কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা সেনা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় ভুল করেছি। রাজনৈতিক কারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।' তিনি জানান, জানুয়ারিতে কুরাখোভো শহর রক্ষায় ব্যর্থ হয় ইউক্রেনীয় বাহিনী, কারণ সেখানে সেনা সংখ্যা রুশ বাহিনীর তুলনায় অনেক কম ছিল।
রাশিয়ার বিপুল সেনা সংখ্যা ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও কাগজে-কলমে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ৮ লাখ ৮০ হাজার এবং রাশিয়ার ইউক্রেন সংলগ্ন বাহিনী ৭ লাখ ২০ হাজার বলে ধারণা করা হয়, বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়াই এগিয়ে।
রাশিয়া দ্রুত নতুন সেনা যোগ করতে পারছে, যেখানে ইউক্রেনের পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। ২০২৪ সালে সাধারণভাবে সেনা মোতায়েন না করেও রাশিয়া ৪ লাখ ৩০ হাজার নতুন সেনা যুক্ত করেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও তাদের সেনাবাহিনী ১ লাখ ৪০ হাজার সদস্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চলতি বছরও একই পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, 'এই যুদ্ধে রাশিয়ার অন্তত ১০ লাখ সেনা অংশ নিচ্ছে।'
এই ব্যবধান কমাতে ইউক্রেন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। একমাত্র উপায় হতে পারে সেনা নিয়োগের বয়সসীমা কমিয়ে ১৮ বছর করা। তবে এটি দেশবাসীর কাছে খুবই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হবে এবং সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, যুদ্ধরত বাবা-মায়েরা চান না তাদের সন্তানরাও যুদ্ধে যেতে বাধ্য হোক। কিন্তু পশ্চিমা মিত্ররা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে, কারণ এতে দ্রুত সেনা সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেও বাস্তবে অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীকে সেনা সমাবেশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই নীতির অসঙ্গতি স্পষ্ট—কিছু সুগন্ধি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সুরক্ষিত থাকলেও অনেক ড্রোন নির্মাতাকে রেহাই দেওয়া হয়নি।
সেনা সংকট কাটাতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন নিয়োগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এতে ১৮-২৪ বছর বয়সীদের জন্য আকর্ষণীয় বোনাস, ভালো বেতন এবং এক বছর পর চাকরি ছাড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে অন্তত ৪ হাজার নতুন সেনা যোগ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু নতুন সেনা নিয়োগ যথেষ্ট নয়, ইউক্রেনকে যুদ্ধের কৌশলও বদলাতে হবে।
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিউক বলেন, 'শুধু সেনা বাড়িয়ে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়, বরং আমাদের কৌশল বদলাতে হবে। আমাদের আক্রমণগুলো আরও বুদ্ধিদীপ্ত হতে হবে, যাতে কম সংখ্যক সেনা দিয়েও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।'
এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও অস্থির হতে পারে। কেউ কেউ আশা করছেন, তিনি হয়তো যুদ্ধবিরতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। তবে এক মাসের মধ্যে তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ চলতে থাকলে ইউক্রেনকে আরও কঠোরভাবে সেনা সংগ্রহের পথ বেছে নিতে হবে।
এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলেন, 'যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, কারণ এখনো পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো কোনো সমাধান আসেনি।' তবে এটি দেশের ভেতরে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর আরও হামলার আশঙ্কা বাড়াতে পারে।