গণশত্রু: উচ্চ মূল্যস্ফীতি যেভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান মূল্যস্ফীতিকে একটি বিপজ্জনক এবং কখনো কখনো মারাত্মক রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা নিয়ন্ত্রণ না করা হলে একটি সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু ঠিক কীভাবে মূল্যস্ফীতি এমন ধ্বংস ডেকে আনে? এর উত্তর রয়েছে লাগাতার উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভয়াবহ চক্রের ভেতরে। এটি দরিদ্র মানুষকে পিষে ফেলে, সারাজীবনের সঞ্চয় ধূলিসাৎ করে, ব্যবসাবাণিজ্য পঙ্গু করে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থাকে চুরমার করে দেয়।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করছে, তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোতে বিপর্যয় ডেকে আনছে। এটি ক্রমাগত তাদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে দেশের পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খরচ কমিয়ে দিচ্ছে, কারণ তাদের আয় কোনোভাবেই নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যারা খাবার বা পুষ্টি গ্রহণে আপস করছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে; আর যারা শিক্ষার খরচ কমাচ্ছে, তারা মূলত নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছে। জীবনযাত্রার মান কমার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক মাপকাঠি নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য এক প্রত্যক্ষ হুমকি।
ক্ষমতায় থাকা যেকোনো সরকারের জন্যই এটি এক অশুভ সতর্কবার্তা। ইতিহাস বলে, জনগণের জীবনযাত্রার মানের ধারাবাহিক পতন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে—যা প্রায়শই ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর জন্য ব্যালট বাক্সে নাটকীয় বিপর্যয় ডেকে আনে।
এই ঘটনার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ে ব্রিটিশ সাধারণ নির্বাচনে যুদ্ধজয়ী উইনস্টন চার্চিলের অপমানজনক পরাজয়। চার্চিলের সেই পরাজয় রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো ধাক্কা দিয়েছিল এবং এটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় এক বিপর্যয় হিসেবে রয়ে গেছে। এই ফলাফল ম্যান্ডেট পাওয়া লেবার পার্টির নেতা ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকেও অবাক করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন চার্চিলের জনপ্রিয়তার রেটিং কখনোই ৭৮ শতাংশের নিচে নামেনি, এমনকি ১৯৪৫ সালের মে মাসেও তা ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। অথচ মাত্র দুই মাস পর যুদ্ধকালীন জোটের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলির কাছে তাকে বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।
চার্চিলের এই লজ্জাজনক পরাজয়ের কারণ কী ছিল?
তার পরাজয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বেভারিজ এবং তার 'বেভারিজ রিপোর্ট' বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। যুদ্ধকালীন সরকারের নির্দেশে তৈরি এই প্রতিবেদনে আয়-নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সামাজিক বীমা ব্যবস্থার রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। যখন মানুষের জীবনযাত্রার মান তলানিতে নেমে গিয়েছিল, তখন এই ব্যবস্থাটি নাগরিকদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সার্বিক কল্যাণের নিশ্চয়তা দেওয়া এক কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রস্তাব করেছিল। পাঁচটি মহা-অশুভ শক্তি: 'রোগব্যাধি, অভাব, অজ্ঞতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বেকারত্ব'-কে নির্মূল করার লক্ষ্যে প্রণীত এই প্রতিবেদনটি ১৯৪২ সালে চার্চিলের কাছে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু চার্চিল মূলত প্রতিবেদনটি একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন।
১৯৪৫ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় চার্চিল জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে ভোটারদের কাছে একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেট চেয়েছিলেন। বিপরীতে, অ্যাটলির লেবার পার্টি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে সমাজকে পুনর্নির্মাণের জন্য বেভারিজ রিপোর্ট সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সামাজিক সুরক্ষার এই প্রতিশ্রুতি ত্যাগ স্বীকারে ক্লান্ত ভোটারদের মনে গভীর দাগ ফেলে, যা লেবার পার্টিকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের দিকে নিয়ে যায়।
ক্ষমতা গ্রহণের পর লেবার সরকার বেভারিজের কাঠামো বাস্তবায়ন করে: সমহারে জাতীয় বীমা অবদানের মাধ্যমে বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, মাতৃত্বকালীন অনুদান, পারিবারিক ভাতা এবং নবগঠিত ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর জন্য তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তখন উইলিয়াম বেভারিজ কমিশনের প্রতিবেদনটি তার সরকারের জন্য একটি মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত উইলিয়াম বেভারিজ ১৮৭৯ সালের ৫ মার্চ রংপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন—যা প্রধানমন্ত্রী তারেকের পৈতৃক জেলা বগুড়া থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে।
ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাত্র দুই মাস আগে পর্যন্ত তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে বসবাস করছিলেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানের এই দীর্ঘ সময়কালেই তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের নতুন সত্তা রূপ লাভ করে। এই দেশটিই বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি দেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হয়। বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাওয়া তারেক রহমানের চেয়ে তার সরকারের অন্য কোনো নীতিনির্ধারকেরই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে বসবাসের এতটা অভিজ্ঞতা নেই।
উইলিয়াম বেভারিজের জন্মের প্রায় একশ বছর পর, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে কার্যকর হওয়া সংবিধানে বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, 'গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে, যে সমাজে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।'
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলাদেশ কীভাবে তার জনগণের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; (গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং (ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কারণে কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিতে জনিত আয়ত্তাতীত অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার।'
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, উল্লেখযোগ্য আর্থসামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও বেভারিজের সেই পাঁচটি 'মহা-অশুভ শক্তির' নিজস্ব সংস্করণগুলো পুরোপুরি জয় করতে পারেনি। সুশাসনের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি দুর্নীতি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের মতো বৈশ্বিক সূচকগুলোতে দুর্বল অবস্থান বারবার দেশের কাঠামোগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বর্তমানে, ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি জনকল্যাণ এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ যদি তার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে সফলভাবে একটি কার্যকর কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে চায়, তবে এই 'মারাত্মক রোগটিকে' পরাজিত করাকেই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
