২০২৪ সাল থেকে জেন-জিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে না ভারত
ভারতের ভোটার তালিকার বার্ষিক সংক্ষিপ্ত হালনাগাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৮ বছর বয়সিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার ও অন্য দুজন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় ২০২৬-২৭ সালের জন্য নির্ধারিত মে-জুন মাসের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও এ প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আরেক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী—২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারণ ওই সিদ্ধান্তগুলো তাদের অজান্তে বা সম্মতি ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল।
ভারতে সাধারণত জানুয়ারিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হলেও এবার তাতে অস্বাভাবিক বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। ফলে হাজার হাজার জেন-জি এখনও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
২০২৫ সালে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় হালনাগাদ (এসআইআর) কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে বিশেষ সংক্ষিপ্ত হালনাগাদ (এসএসআর) স্থগিত রয়েছে। ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, এই রাজ্যজুড়ে প্রতি বছর এসএসআর পরিচালনার যে কয়েক দশকের পুরোনো প্রথা ছিল, এই ঘটনার ফলে তা ব্যাহত হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনার সান্ধু ও জোশী এ প্রথা ফের চালু করতে 'জোর দাবি ও তাগিদ' দিয়েছিলেন।
ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, সান্ধু ও জোশী এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তারা যুক্তি দিয়েছেন, শুধু এসআইআর সম্পন্ন হওয়ার মানে এই নয় যে তা বার্ষিক এসএসআর প্রথাকে প্রতিস্থাপিত বা বাতিল করে দেবে।
এসএসআরের বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) নিজস্ব ভোটার তালিকা ম্যানুয়ালের কথা উল্লেখ করে তারা বলেছেন, নতুন যোগ্য ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনীয়।
ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসিআইয়ের অভ্যন্তরে এই মতবিরোধের কারণে সিইসি শেষ পর্যন্ত আইনি মতামত নিতে বাধ্য হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সান্ধু ও জোশী এসএসআর ফের চালু করার পক্ষে নিজেদের অবস্থান আবারও জোরালোভাবে ব্যক্ত করেছেন।
হাজার হাজার যোগ্য জেন-জি এখনও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত
এই বার্ষিক হালনাগাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের নির্বাচন কমিশন সচিত্র ভোটার তালিকা আপডেট করে। এর মাধ্যমে ভোটার তথ্যভান্ডারের বিভিন্ন অসংগতি, তথ্যের অমিল ও অন্যান্য ত্রুটি চিহ্নিত করা যায়।
১ জানুয়ারির নির্ধারিত সময়সীমার পরে কারও বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে, তাকে যেন ভোটার হওয়ার জন্য পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে আরও তিনটি সময়সীমা বা যোগ্যতার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তারিখগুলো হলো—১ এপ্রিল, ১ জুলাই ও ১ অক্টোবর। ফলে এসএসআর একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। যত দ্রুত সম্ভব সব যোগ্য নাগরিকের সর্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
তবে ২০২৬-২৭ সালের হালনাগাদ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই সময়সূচি ইতিমধ্যে ব্যাহত হয়েছে। সাধারণত মে মাসের শেষের দিকে এসএসআর প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরই বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে প্রাক-হালনাগাদ কার্যক্রম চলে প্রায় দুই-তিন মাস। এতে তালিকা নিয়ে কোনো দাবি বা আপত্তি জানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়।
হালনাগাদ শুরুর ঘোষণাই যেহেতু আটকে আছে, তাই পরের ধাপগুলোও বিলম্বিট হচ্ছে। ফলে প্রথা অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ধারাটি বজায় রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৭ সালে যেসব রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা আছে, সেসব রাজ্যের জন্য বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরাখণ্ড ও পাঞ্জাবসহ যেসব রাজ্যে বর্তমানে এসআইআর কার্যক্রম চলছে, সেখানে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে বিহারের মতো যেসব রাজ্যে অনেক আগেই এই নিবিড় সংশোধনীর কাজ শেষ হয়েছে, সেখানেও নতুন করে ভোটার তালিকা সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে সেখানকার হাজার হাজার জেন-জি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, এসব মতবিরোধের প্রভাব ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পড়তে শুরু করেছে। কমিশনের তিন সদস্য একসঙ্গে স্বাক্ষর না করার কারণে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা ও উপ-নির্বাচন কমিশনারের বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন আটকে আছে।
এছাড়া নিজেদের প্রতিবেদনের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের দ্বারস্থ হয়েছেন। ইকোনমিক টাইমসের তথ্যমতে, এসব কর্মকর্তার অনেকেই ইতিমধ্যে অন্য দপ্তরে বদলি হয়ে কাজে যোগ দিলেও তাদের প্রতিবেদনগুলো এখনও আটকে আছে।
প্রসঙ্গত, ইকোনমিক টাইমের যে প্রতিবেদক এই সংবাদটি করেছেন, তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে 'নামের অমিল' থাকার কারণে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ার সময় তাকেও নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
