পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে গোপনে বাদ দেওয়া হয়েছিল ১৬ লাখ মানুষকে
ছাব্বিশ বছর বয়সি শাহিনুরা বেগম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ বিধানসভা আসনের পার্ট ৩৪-এর বাসিন্দা। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) যখন 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শেষে পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে, তখন তার নামের পাশে লেখা ছিল 'বিচারাধীন'।
শাহিনুরার ফাইল যায় একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে। ২৭ মার্চ প্রকাশিত দ্বিতীয় সম্পূরক তালিকায় ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) পেয়ে তার নাম আবার ভোটার তালিকায় ফিরে আসে। কিন্তু ২ এপ্রিল দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে একটি আপিল নথিভুক্ত হয়। আপিলটি শাহিনুরা নিজে করেননি, বরং সেটি করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার সেবা পোর্টালে এই রেকর্ড এখনও আছে। ভারতের যেকোনো নাগরিক সেখানে লগ-ইন করে নিজেদের রেকর্ড ও আবেদনের তথ্য দেখতে পারেন। ডিজিটাল ফর্মে এপ্রিলের ওই আপিল আইডি হলো ও আপিলের টার্গেট চিহ্নিত রয়েছে। 'আপিল অ্যাগেইনস্ট এপিআইসি নং' চিহ্নিত ঘরে শাহিনুরা বেগমের ভোটার আইডি নম্বরটি লেখা রয়েছে। সিস্টেমের কার্যবিবরণী বেশ সংক্ষিপ্ত। প্রথম এন্ট্রিতে লেখা, 'অপেক্ষমাণ'। এরপর ১৮ এপ্রিল বিকেল ৪টা ৩৩ মিনিটে যুক্ত হওয়া দ্বিতীয় এন্ট্রিতে লেখা: 'ই-রোলে অন্তর্ভুক্ত'।
ট্রাইব্যুনাল শেষপর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে শাহিনুরার নাম বাদ দিতে রাজি হয়নি। ১৩ এপ্রিল দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর, ২১ এপ্রিল যখন সম্পূরক তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন সেটিতে তার নাম দেখা যায়। তালিকার নিচের একটি ফুটনোটে নিশ্চিত করা হয় যে, এর আগে প্রকাশিত তালিকাতেই তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শাহিনুরা বেগমকে দুইবার নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করা হয়। দ্বিতীয়বারের এই হয়রানি তৈরি করেছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এক ব্যক্তি; যে শাহিনুরার প্রথম ক্লিয়ারেন্স বাতিল করতে চেয়েছিলেন। প্রথমবার ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার মাত্র ছয় দিনের মাথায় হঠাৎ তার বিরুদ্ধে এই আপিল করা হয়। এরপর আপিল ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার আগপর্যন্ত পার হয়ে যায় আরও ১১টি দিন।
কে এই আপিল দায়ের করেছিল; কেন? এ প্রশ্ন এখন আর কেবল রায়গঞ্জের একজন ভোটারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই।
তালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে ১৬ লাখ আপিল
শাহিনুরার মতো এমন ঘটনা আরও ঘটেছে বলে ভারতের নির্বাচন কমিশন এ বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রকাশ করে।
সুপ্রিম কোর্টে এমপি ডেরেক ও'ব্রায়েনের করা এক আবেদনের জবাবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালগুলোতে জমা পড়া আপিলের বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরে। দায়ের হওয়া মোট ৩৮ লাখ ৩১ হাজার ৪২৯টি আপিলের মধ্যে ২২ লাখ ২১ হাজার ১১৮টি আপিল করেছিলেন ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে লড়াইরত ভোটাররা।
কিন্তু চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হলো, বাকি ১৬ লাখ ১০ হাজার ৩১১টি আপিল করা হয়েছিল অন্য কারও নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে। সহজ কথায়, অন্য কোনো ব্যক্তিকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই এই ১৬ লাখ আবেদন করা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিএলও দ্য ওয়্যারকে বলেন, 'আপিলের স্ট্যাটাস যাচাই করতে ওটিপি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যেসব ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং যারা আপিল করেছেন, তারা কেবল আপিল করার সময় ব্যবহৃত ফোন নম্বরে পাঠানো ওটিপি দেওয়ার পরেই তাদের আপিলের অবস্থা দেখতে পারবেন। আর নাম তালিকাভুক্ত হওয়া যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে, তাদের আপিলের স্ট্যাটাস বর্তমানে এরর মেসেজ দেখাচ্ছে।'
এর আগে হওয়া বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার সঙ্গে তুলনা করলে এই আপত্তিগুলোর মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে চূড়ান্ত সংশোধনের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। আদালত যৌক্তিক অসংগতির কারণে চিহ্নিত ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের বিষয় তাদের নিজস্ব বাছাই করা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থাপন করে। ওই কর্মকর্তারা ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ জন ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করেন। তারা বাকি ৩২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬০ জন ব্যক্তিকে যাচাই করে আইনিভাবে তাদের নাম ভোটার তালিকায় রাখার ক্লিয়ারেন্স দেন।
তালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে হওয়া ওই ১৬ লাখ ১০ হাজার ৩১১টি আপিল ওই বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া মোট ভোটারের ৪৯.১ শতাংশ। অর্থাৎ একজন বিচারক যে দুজন ব্যক্তিকে যাচাই করে ভোটার তালিকায় তাদের নাম সুরক্ষিত করেছিলেন, তার প্রতি দুজনের বিরুদ্ধে প্রায় একটি করে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হয়েছে।
যাদের নাম বাদ দেওয়ার আপিল হচ্ছে তারা কোনো বিজ্ঞপ্তি পাচ্ছেন না
নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যেকোনো ব্যক্তি আপিলের একটি ডিজিটাল বা ফিজিক্যাল রসিদ পেয়ে থাকেন। এটি ভোটারের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্দেশ করে। যেসব নাগরিক ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের নাম মুছে ফেলার আবেদন করেন, তারা একটি বিস্তারিত স্বীকৃতিপত্র পান। এতে আপিল নম্বর, আবেদন জমার সঠিক সময়, আইনি ভিত্তি ও ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ডিজিটাল স্বাক্ষরযুক্ত একটি ঘোষণাপত্র লিপিবদ্ধ থাকে। ফর্মে আপিলের টার্গেট নির্দিষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ জায়গাও থাকে। নাম পুনরুদ্ধারের একটি সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে ভোটারের নিজের নাম সেখানে থাকে এবং তারা আবেদনের বিপরীতে রসিদ পান।
যখন তৃতীয় কোনো পক্ষ আপত্তি দায়ের করে, তখন সেই নির্দিষ্ট জায়গায় যার বিরুদ্ধে আপিল করা হচ্ছে, তার নাম লিখতে হয়। কিন্তু একটি বড় পার্থক্য হলো, যার বিরুদ্ধে আপিল করা হচ্ছে, তিনি কোনো ধরনের যোগাযোগ বা বিজ্ঞপ্তি পান না।
এই মুহূর্তে সারা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ২.৫০ শতাংশ বা ১৬ লাখ ১০ হাজার ৩১১ জন ভোটারের এটাই বাস্তবতা। এই ব্যক্তিদের প্রত্যেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সক্রিয় আবেদনের করা হয়েছে। আবেদনকারী নম্বর, তারিখ ও ডিজিটাল স্বাক্ষরযুক্ত আইনি নথি পান। কিন্তু যার বিরুদ্ধে আবেদন করা হয়, তিনি কিছুই পান না। তাই বেশিরভাগই ধারণাও করতে পারেন না যে তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে, বা তাদের ভোটাধিকার কোনো বিচারাধীন প্রক্রিয়ায় আটকে আছে।
ফলে আপিল সম্পর্কে না জানা একজন ভোটার হয়তো আত্মপক্ষ সমর্থন, নথিপত্র জমা দেওয়া, শুনানিতে অংশ নেওয়া বা নিজের পক্ষে প্রতিনিধি নিয়োগ করার কোনো সুযোগই পান না।
একজন নির্বাচন কমিশনারের যে প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি
নির্বাচন কমিশন স্বেচ্ছায় ১৬ লাখ ১০ হাজার ৩১১-র এই পরিসংখ্যান সরবরাহ করেনি। গত ২৫ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক নির্বাচন প্যানেলকে কেবল বিচারাধীন আপিল, নিষ্পত্তি হওয়া আপিল ও নাম ফিরে পেতে বাদ পড়া ভোটারদের করা আপিলের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছিল। কমিশন এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি গণ-আপত্তির বিষয়টিও যুক্ত করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব আপিলগুলো আসলে কারা দায়ের করেছিল, হলফনামায় তা প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্য গোপনের এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী মোট ১৪টি ভিন্নমতের নোট দিয়েছেন।
১২ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের ট্রাইব্যুনালগুলোর সামনে কমিশনের পক্ষ থেকে আপিল করার অনুমোদন কে দিয়েছিল, তা জানতে চেয়ে কমিশন কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি লেখেন সান্ধু। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সান্ধু নথিবদ্ধ করেছিলেন যে এই আপিলগুলো দায়ের করার ভিত্তি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি, জোশী বা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা—কেউই কিছু জানতেন না।
ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল থেকে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সান্ধু ১২ আগস্ট অভ্যন্তরীণভাবে এর জবাব চেয়েছিলেন। তার পাঁচ মাস আগে, ১৩ এপ্রিলের এক আদেশে বেঞ্চ উল্লেখ করেছিল, সিস্টেমে ইতিমধ্যে ৩৪ লাখেরও বেশি আপিল জমা পড়েছে। কেবল অন্যায়ভাবে নাম বাদ পড়ার কারণেই নয়, বরং ক্লিয়ারেন্স পাওয়া ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি করা ব্যক্তিদের পরিকল্পিত চ্যালেঞ্জের ফলেও আপিলের এই বন্যা বয়ে যায়।
ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত ভিন্নমতের নোটগুলো থেকে এমন এক ডিজিটাল ব্যবস্থার কথা জানা যায়, যা কমিশনাররা নিজেরাই বুঝতে পারেননি বলে স্বীকার করেছেন।
২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল কমিশনার সান্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করেন, তিনি নতুন আইটি মডিউল ও পোর্টালগুলোর বিষয়ে পুরোপুরি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানতে পারছেন। ২৯ মের মধ্যে কমিশনার জোশী সতর্কতা জারি করেন, ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারকে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে অডিটের দাবি জানান। ১৩ জুলাই সান্ধু এই সতর্কবার্তাকে সমর্থন করেন।
১৪ আগস্টের মধ্যে সান্ধু সিস্টেমের একটি গুরুতর ত্রুটির কথা নথিবদ্ধ করেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইসিআই নেট সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তথ্যপ্রযুক্তির মহাপরিচালক দাবি করেন যে এই প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করা বা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই তার নেই।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
