বিস্কুট-স্ন্যাকস থেকে মসলা: মালয়েশিয়ার বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য
বড় সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকান—মালয়েশিয়ায় ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের উপস্থিতি। বিস্কুট, নুডলস, জুস, স্ন্যাকস, মসলা, চাল, ডাল, রান্নার তেলসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য দেশটির মূলধারার খুচরা বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান অবস্থানে রয়েছে প্রাণ। প্রায় ১৫ বছর ধরে মালয়েশিয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। বড় খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি নিজস্ব বিতরণ ও খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে তারা।
এ ছাড়া এসিআই ফুডসের 'পিওর' ও 'ফান', অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের বিস্কুট ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য এবং আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের 'আফি', 'স্পিড' ও 'ক্লেমন' পণ্যও মালয়েশিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব ব্র্যান্ডের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির গণ্ডি পেরোনোর চেষ্টা
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের প্রাথমিক চাহিদা তৈরি হয়েছিল দেশটির বড় বাংলাদেশি অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তবে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সরকারি সংস্থাগুলোর দেওয়া পরিসংখ্যানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
এখন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্রেতাগোষ্ঠীর বাইরে গিয়ে মালয়েশীয়, ভারতীয়, ইন্দোনেশীয়, নেপালি ও অন্যান্য অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছেও পণ্য পৌঁছে দিতে চাইছে।
প্রাণের বিশাল নেটওয়ার্ক
প্রাণ জানিয়েছে, ২০১০ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় তাদের কার্যক্রম চলছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কৌশলগত অংশীদার পিনাকল ফুডস (এম) এসডিএন তাদের পণ্য বাজারজাত করে।
বর্তমানে পিনাকল মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮৫০ ধরনের প্রাণ পণ্য বাজারজাত করছে। এর মধ্যে রয়েছে পানীয়, বিস্কুট ও স্ন্যাকস থেকে শুরু করে চাল, মসলা, আচার, নুডলস ও ক্যানজাত খাবার। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মালয়েশিয়ায় প্রাণ পণ্যের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২৪-২৫ কোটি ডলার।
মালয়েশিয়ার মাইদিন, কেকে সুপার মার্ট, ইকনসেভ, জায়ান্ট, এইওন, এনএসকে, এইওন বিগ, লোটাস, এসটি রোজিয়াম মার্ট, সেগি ফ্রেশ ও লুলু—এ ধরনের বড় খুচরা বিক্রয় চেইনগুলোতে প্রাণের পণ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া নির্বাচিত পেট্রোনাস ও শেল স্টেশনেও এসব পণ্য বিক্রি হয়। কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন স্থানে প্রাণের পণ্য দোকানের তাকেও দেখা গেছে। স্থানীয় মালয়েশীয় ক্রেতাদেরও এসব পণ্য কিনতে দেখা গেছে।
নিজস্ব বিতরণ নেটওয়ার্ক
শুধু আমদানিকারক হিসেবে কাজ না করে নিজস্ব বিতরণ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে পিনাকল। পিনাকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম ভুইয়া জানিয়েছেন, সুঙ্গাই বুলোহেতে ৫ একর জায়গার ওপর আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় ওয়্যারহাউজ রয়েছে। এর পাশাপাশি কুয়ালালামপুর, কোটাবারু, জোহর বাহরু, ইপোহ, পেনাং, মালাক্কা, তেরেংগানু, কুয়ানতান ও সাবাহতে আঞ্চলিক ওয়্যারহাউজ রয়েছে।
প্রায় ১৫০টি প্রাণের লোগোযুক্ত গাড়ি পণ্য বিতরণে ব্যবহৃত হয়। বিপণন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রায় ৭০০ জন কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। স্থানীয় আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে মালয়েশীয়, চীনা ও নেপালি কর্মীও রয়েছেন।
প্রতি মাসে গড়ে বাংলাদেশ থেকে ৩০০ কনটেইনার পণ্য আমদানি করে পিনাকল। সালিম জানান, মালয়েশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৭ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য বিক্রি করে। প্রতি বছর তাদের ব্যবসা প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে আঞ্চলিকভাবে পণ্য সংগ্রহও রয়েছে। নারকেলের পানি, পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, বিস্কুট, স্ন্যাকস, কনডেন্সড মিল্ক, চাল, ডাল ও রান্নার তেলের মতো কিছু পণ্য মালয়েশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করা হয়। এ ছাড়া ভারত থেকে চাল, মিয়ানমার থেকে ইলিশ এবং পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে পুনরায় প্যাকেটজাত ও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।
খুচরা ব্যবসাতেও প্রবেশ করেছে পিনাকল। 'পাসার রায়া পিনাকল' নামে কুয়ালালামপুরের আশপাশে তাদের তিনটি দোকান রয়েছে। আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
হালাল বাজারে সম্ভাবনা
বাংলাদেশি ভোক্তাদের গণ্ডির বাইরে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে মালয়েশিয়ায়। দেশটির বড় ও বৈচিত্র্যময় বাজার, আধুনিক খুচরা বিক্রয়ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী হালাল পণ্যভিত্তিক অর্থনীতি বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়ার হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির হালাল পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬৮৫ কোটি ২০ লাখ রিঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য ও পানীয় খাতের রপ্তানি ছিল ৩৬৮ কোটি ৬০ লাখ রিঙ্গিত, যা মোট হালাল রপ্তানির ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে এই সম্ভাবনা থাকলেও দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের অংশ এখনো খুবই কম। মালয়েশিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২১৮ কোটি রিঙ্গিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ ২১০ কোটি রিঙ্গিত মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করেছে ১ হাজার ৮ কোটি রিঙ্গিতের পণ্য। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে বস্ত্র, পোশাক ও জুতা।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্যেও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় সবজি, আলু, শস্য, ফলের জুস, মাছ, ওষুধ, প্লাস্টিক, চা ও মসলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সনদ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশি খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য হালাল সনদ এবং বাজারের নিয়মকানুন মেনে চলা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সালিম বলেন, হালাল সনদ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধা উন্নত করা গেলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে শুধু বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভর না করে বৃহত্তর ভোক্তাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের দাম, প্যাকেজিং, স্বাদ, সনদ এবং সরবরাহব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের কাছে পরিচিত এসব ব্র্যান্ডের উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবেই আকর্ষণ তৈরি করছে। বগুড়ার শিক্ষার্থী রাকিবুল হারিস প্রায় এক বছর ধরে আইএনটিআই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্য দেখলে তার ভালো লাগে। প্রয়োজন হলে এবং পাওয়া গেলে তিনি প্রাণের পণ্য কেনেন।
তার মতে, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
