অক্টোবরের শেষে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ আলোচনা, লক্ষ্য ২০২৭
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে।
এ উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দুই দেশ।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী এ তথ্য জানান।
এর আগে, তিনি মেলার বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে প্রাণ, এপেক্স কনভিনিয়েন্স ফুডস লিমিটেড, ঘরের বাজার, প্যারাগন এগ্রো লিমিটেড, তালুকদার এগ্রো ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ, নোরিশ ফুডস লিমিটেড এবং বায়োফার্মা লিমিটেডের স্টল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও কৌশলগত বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
লক্ষ্য ২০২৭: কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তি
সংবাদ মাধ্যমকে হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ এফটিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরকে নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম দফার এই আলোচনা পুরো চুক্তি প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে।
একই দিনে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদও প্রথম দফার বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আসন্ন ঢাকা আলোচনায় দুই দেশের বাজারসুবিধা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের প্রসার এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টিসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় অগ্রাধিকার পাবে।
উল্লেখ্য, গত জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এফটিএ আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন। ওই সফরে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সামগ্রিক ও ভবিষ্যৎমুখী এফটিএ সম্পাদনের বিষয়ে যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল।
হালাল সনদ ও কারিগরি দক্ষতার তাগিদ
মালয়েশিয়ায় সম্ভাবনাময় হালাল পণ্যের বাজার তৈরি প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্যকে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার অফিসিয়াল হালাল কর্তৃপক্ষ 'জাকিম' অনুমোদন ও সনদ দিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেও তারা হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে হাইকমিশনার বলেন, 'কেবল পারস্পরিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মেলাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে পর্যাপ্ত কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে হবে।'
কেন প্রয়োজন এই এফটিএ?
বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চালু থাকলেও কোনো প্রাধিকারমূলক বা পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি নেই। ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা শুল্ক ছাড়, বিশেষ বাজার সুবিধা কিংবা বাণিজ্য সহজীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মালয়েশিয়ার সরকারি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা 'মেট্রেড'-এর তথ্যমতে, একটি পূর্ণাঙ্গ এফটিএর মাধ্যমে অংশীদার দেশগুলো পরস্পরের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এর আওতায় শুল্ক কাঠামোর আধুনিকীকরণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা খাত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়।
মেট্রেডের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার এস. জয় শংকর এ প্রসঙ্গে বলেন, 'বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজতর করতে উভয় দেশই সচেষ্ট রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ যৌথ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।'
বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির সময়কালটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা সংকুচিত হয়ে আসবে। সেই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য যেমন—তৈরি পোশাক (নিট ও ওভেন), চামড়া ও পাদুকা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে এফটিএ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। অপরদিকে, মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেমন—জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক সামগ্রীর বাণিজ্য কাঠামোও এই চুক্তির মাধ্যমে সুসংগঠিত হবে।
বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি কমানোর চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে বর্তমানে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট:
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় মাত্র ২৯৩.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয় ২.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য। ফলে এক অর্থবছরেই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৮ মাসেও এই ব্যবধান প্রায় একই রকম রয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় ৩০৫.৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২.২৬ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, খাদ্য ও পানীয়, প্রক্রিয়াজাত শাকসবজি এবং মসলা। এর বিপরীতে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে প্রধানত খনিজ জ্বালানি, ভোজ্য তেল, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি ও শিল্প রাসায়নিক আমদানি করে থাকে।
