যুদ্ধ-অভিযান থেকে পর্বতারোহণ: বিশ্বের সর্বত্র শ্রমিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি সেফটি জুতা
১৯৫৩ সালে ফুজিয়ান-তাইওয়ান লেদার ফ্যাক্টরি হিসেবে যাত্রা শুরু করা গোল্ডেন চ্যাং ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি লিমিটেড ধীরে ধীরে ফাংশনাল ও সেফটি (সুরক্ষামূলক) জুতা উৎপাদনে বিশেষ মনোযোগ দেয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী।
কোম্পানিটি একই সময়ে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি সুফল বয়ে এনেছে। কারণ ইলেকট্রনিকস পণ্য তৈরির তুলনায় জুতা উৎপাদন শিল্পে অনেক বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডক জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির অপারেশনস ম্যানেজার টনি হেশিয়েহ।
চলতি মাসের শুরুতে কোম্পানির কর্ণফুলী ইপিজেড কারখানায় টিবিএসকে হেশিয়েহ বলেন, 'বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি পরবর্তী সময়ে সঠিক ও ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'উচ্চ মজুরি, শ্রমিক নিয়োগে জটিলতা, উচ্চ কর এবং আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ভিয়েতনামে আমাদের কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশে আমাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে।'
প্রায় ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে টিম্বারল্যান্ড থেকে আরিয়াতের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য বিশেষায়িত সেফটি জুতা তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
গোল্ডেন চ্যাংয়ের বাংলাদেশের কারখানায় তৈরি জুতা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে—যুদ্ধ-অভিযানে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, নাবিক ও পর্বতারোহী থেকে শুরু করে মাটির গভীরের খনি ও ভারী শিল্পকারখানার শ্রমিকদের পায়ে এবং এমনকি ঘোড়দৌড়ের জকিদের পরা কাউবয় বুট হিসেবেও এসব জুতা ব্যবহৃত হচ্ছে।
কোম্পানিটি চারটি কারখানা পরিচালনা করছে—চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) দুটি এবং কুমিল্লা ইপিজেডে দুটি। এসব কারখানায় বছরে প্রায় ১ কোটি জোড়া জুতা তৈরি হয়।
এসব কারখানায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি শ্রমিকের তৈরি পণ্য গত অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ে ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছে।
মাটির গভীরের খনি থেকে পর্বত পর্যন্ত
কোম্পানিটির তথ্যমতে, তাইওয়ানভিত্তিক বিনিয়োগকারীর কর্ণফুলী ইপিজেডে সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড নামে দুটি কারখানা রয়েছে। কুমিল্লা ইপিজেডে সিন চ্যাং এবং গোল্ডেন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড নামে আরও দুটি কারখানা রয়েছে।
এসব কারখানায় লেদার-আপার, রাবার ও প্লাস্টিকের জুতা, ওয়াটারপ্রুফ জুতা ও বুট এবং অ্যালুমিনিয়াম-টো সেফটি জুতাসহ বিভিন্ন ধরনের সেফটি জুতা ও জুতার বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করা হয়। এসব কারখানার মূল মনোযোগ সেফটি ও ফাংশনাল জুতার ওপর।
উদাহরণস্বরূপ, টিম্বারল্যান্ডের প্রিমিয়াম ওয়াটারপ্রুফ আউটডোর বুট নির্মাণকাজে টেকসই সেফটি জুতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আরিয়াত তৈরি করে প্রিমিয়াম কাউবয় বুট, বিশেষায়িত রাইডিং বুট এবং খামার ও ভারী শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী জুতা।
কর্ণফুলী ইপিজেডের দুটি কারখানায় তৈরি ৫০ লাখ জোড়া জুতার ৫০ শতাংশ টিম্বারল্যান্ডের জন্য এবং ৩০ শতাংশ আরিয়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কুমিল্লা ইপিজেডের দুটি কারখানায় তৈরি ৫০ লাখ জোড়া জুতার ৭০ শতাংশ তৈরি করা হয়েছে উলভারিন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের জন্য। তেল ও গ্যাস উত্তোলন, কেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং মাটির গভীরের খনির মতো ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের সুরক্ষায় ব্যবহারের জন্য তৈরি সেফটি জুতার জন্য ব্র্যান্ডটি পরিচিত।
এই ব্র্যান্ডগুলো ছাড়াও গোল্ডেন চ্যাংয়ের বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে নরওয়ের ব্র্যান্ড হেলি হ্যানসেনের জন্য জুতা তৈরি হয়। নাবিক, পর্বতারোহী ও শিল্পকারখানার শ্রমিকদের জন্য উচ্চমানের ওয়াটারপ্রুফ সেফটি জুতার জন্য ব্র্যান্ডটি পরিচিত।
এ ছাড়া মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর বিশ্বস্ত সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড বেলভিলের জন্য মিলিটারি ও ট্যাকটিক্যাল বুট এবং মিলিটারি ফুটওয়্যার ব্র্যান্ড ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের পণ্যও তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে কারহার্ট, কোডিয়াক, ড্যান পোস্ট ও পেপরাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতাও তৈরি করা হয়।
কর্ণফুলী ইপিজেডের জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেডের এইচআর ও কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার মো. আরিফুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমাদের কারখানায় তৈরি প্রিমিয়াম সেফটি জুতার ব্র্যান্ডগুলো গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি জোড়া ১৫০ থেকে ৩০০ ডলারে বিক্রি হয়। আমাদের চারটি কারখানায় বছরে ১ কোটি জোড়া জুতা তৈরি হয়।'
যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ বাংলাদেশি রপ্তানিকারক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিকারকদের মধ্যে শীর্ষ পাঁচে ছিল গোল্ডেন চ্যাং শুজ।
ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির মোট রপ্তানি আয়ের ৭১ শতাংশ বা ১০০ মিলিয়ন ডলার এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও রপ্তানি হয়।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা ইপিজেডের কারখানা থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে রপ্তানি আয় শুরু করে।
এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ১০৬ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রাবারের সোল ও পিওর লেদারের তৈরি বিশেষায়িত বুট বা সেফটি জুতা রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট ৪৩৩ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
এর মধ্যে শুধু গোল্ডেন চ্যাং গ্রুপের রপ্তানি আয় ছিল ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পণ্যটির মোট রপ্তানির প্রায় ৫৮ শতাংশ এসেছে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে।
শ্রমনির্ভর শিল্প
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালের জুলাইয়ে কুমিল্লা ইপিজেডে সিন চ্যাং শুজ নামে বাংলাদেশে প্রথম কারখানা চালু করে। এতে বিনিয়োগ ছিল ১ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার এবং কর্মী ছিলেন ১৪ জন।
এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটি কর্ণফুলী ইপিজেডে আরও একটি কারখানা ভবন নির্মাণ করছে।
চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে চারটি কারখানায় প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১০২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এসব কারখানায় ১২ হাজার ৪৬২ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে।
দ্রুত সম্প্রসারিত বৈশ্বিক বাজার
ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস, গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ, মরডর ইন্টেলিজেন্স এবং রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের বাজার গবেষণা প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ফুটওয়্যার বা শিল্প খাতের সুরক্ষামূলক জুতার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, বর্তমানে ১২ বিলিয়ন থেকে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এই বাজার ২০৩০ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১৬ বিলিয়ন থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
