বিক্ষোভ অব্যাহত, মার্কিন হুমকির মুখেও নতি স্বীকার না করার ঘোষণা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নতি স্বীকার না করার অঙ্গীকার করেছেন। মুদ্রাস্ফীতির কারণে সৃষ্ট কয়েক দিনের অস্থিরতার পর ধরপাকড় তীব্র হওয়ার খবরের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসার হুমকি দিলে খামেনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।
শনিবার এক রেকর্ডকৃত ভাষণে খামেনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র 'শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবে না' এবং দাঙ্গাকারীদের 'উচিত শিক্ষা' (তাদের জায়গায় রাখা) দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো শনিবার তিনজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত রবিবার থেকে ইরানজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ইতিমধ্যে ১০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মূলত জাতীয় মুদ্রা 'রিয়াল'-এর মান কমে যাওয়ার ফলে ইরানের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। এ অর্থনীতি আগে থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।
অর্থনৈতিক সংকট
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে ইরানের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা গেছে, যা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলকারীরা অন্যান্য ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন— 'আমরা দর্শক চাই না: আমাদের সঙ্গে যোগ দিন'।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মেহর এবং ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, মালেকশাহী নামের একটি পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরে একদল 'সশস্ত্র বিক্ষোভকারী' পুলিশ স্টেশনে ঢোকার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য এবং দুইজন বিক্ষোভকারী নিহত হন।
কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি দ্বিমুখী অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তারা একদিকে বলছে যে, অর্থনৈতিক কারণে সৃষ্ট এই প্রতিবাদগুলো বৈধ এবং এগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। আবার অন্যদিকে, রাজপথে সহিংস সংঘর্ষের সময় অনেক বিক্ষোভে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় বাজার ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে খামেনি বলেন, 'ব্যবসায়ীরা (বাজারিরা) ঠিকই বলছেন। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা করা অসম্ভব—তাদের এই দাবি সত্য।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলব, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন। দাঙ্গাকারীদের তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে (তাদের জায়গায় রাখা উচিত)।'
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সহিংসতার খবরগুলো মূলত ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর ছোট ছোট শহরগুলোকে কেন্দ্র করে আসছে, যেখানে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অস্থিরতায় নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও এক ডজনেরও বেশি সদস্য আহত হয়েছেন।
কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেংগাও শুক্রবার গভীর রাতে জানিয়েছে যে, তারা ১৩৩ জন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে। এই সংখ্যাটি আগের দিনের তুলনায় ৭৭ জন বেশি।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র (ইরানের বিরুদ্ধে) সামরিক পদক্ষেপ নিতে 'পুরোপুরি প্রস্তুত' তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেননি। উল্লেখ্য যে, গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সাথে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছিল।
এই সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ইরানের নেতাদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। দেশটি বর্তমানে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে; যেখানে একদিকে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক অঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সরকারকে লড়াই করতে হচ্ছে।
২০২৩ সালে গাজায় ইরানের মিত্র হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান তার আঞ্চলিক অবস্থানে একের পর এক বড় ধরণের কৌশলগত বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে।
ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক অংশীদার হিজবুল্লাহ প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিরিয়ায় তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও মার্কিন হামলায় তাদের ব্যয়বহুল পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে পড়েছে এবং শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতারা নিহত হয়েছেন, যা তেহরানের উচ্চপর্যায়ে বিশাল গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের বিষয়টি প্রকাশ করে দিয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা
২০২২ সালের শেষের দিকে কুর্দি নারী মাহসা আমিনি'র পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী যে বিশাল গণ-আন্দোলন হয়েছিল, তারপর থেকে এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। এই সপ্তাহের বিক্ষোভগুলো আয়তনে আগের সেই আন্দোলনের সমান না হলেও, গত তিন বছরের মধ্যে এটিই কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে কঠিন অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা।
হেংগাও-এর মতো মানবাধিকার সংস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় কর্মীরা ইরানজুড়ে ক্রমাগত বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতার খবর দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে যে, 'অনুপ্রবেশকারীরা' প্রতিবাদের নামে সম্পদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইরানের পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী এলাকাগুলো থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে পেট্রোল বোমা এবং হাতে তৈরি পিস্তল তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসংখ্য পোস্টে জানানো হয়েছে যে, গত রাতে তেহরানের তিনটি জেলাসহ বেশ কিছু শহর ও মফস্বলে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এসব প্রতিবেদনের সত্যতা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি।
