‘সেকেলে’ বলে একসময় হাসাহাসি হতো, কোরিয়ার সেই গানই এখন নতুনভাবে ফিরে আসছে
কে-পপেরও আগে ছিল 'ট্রট'। দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী এই সংগীত ঘরানাটির নাম এসেছে আমেরিকান 'ফক্সট্রট' থেকে। কারণ ট্রট গানের ছন্দের সঙ্গে ফক্সট্রটের দুই-তালের ছন্দের অদ্ভুত মিল রয়েছে।
কয়েক দশক ধরে ট্রট ছিল কোরিয়ার মানুষের হৃদস্পন্দন। এই ঘরানাই দেশকে উপহার দিয়েছিল প্রথম সংগীত সুপারস্টারদের। কিন্তু কে-পপের ঝকঝকে দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ট্রট কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। অনেকেই একে সেকেলে বা 'ট্যাকি' বলে উপহাস করতেন।
তবে সেই দিন বদলেছে। আবারও সংবাদের শিরোনামে ট্রট। সৌজন্যে সোশ্যাল মিডিয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
কোরিয়ার কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন জনপ্রিয় কে-পপ গানগুলোকে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ট্রট-স্টাইলে বদলে ফেলছেন। সেই সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন এআই দিয়ে তৈরি আইডলদের ছবি—যাদের পরনে থাকে চকচকে স্যুট আর ফোলানো চুল, ঠিক যেমনটা পুরোনো দিনের ট্রট শিল্পীরা সাজতেন।
ইনস্টাগ্রাম, লাইন বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে এই ভিডিওগুলো লাখ লাখ ভিউ পাচ্ছে।
তবে সমালোচকরা কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, এটি ট্রটের আসল নির্যাস থেকে অনেক দূরে সরে গেছে এবং এটি কেবলই সাময়িক হুজুগ।
'ক্লাসিক কে-পপ'
১৯৩০-এর দশকে যখন কোরিয়া জাপানি উপনিবেশ ছিল, তখন ট্রটের জন্ম। সংগীত সমালোচক জং মিনজে জানান, কোরিয়ান লোকসংগীতের সঙ্গে জাপানি 'এনকা' এবং পশ্চিমা জ্যাজ বা ব্লুজের মিশ্রণে এই ধারার উদ্ভব।
ট্রট গানে প্রায়ই ফুটে ওঠে 'হান'—এক গভীর দুঃখ, ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাসের অনুভূতি। কোরিয়ার পরাধীনতার ইতিহাস আর বিচ্ছেদের বেদনা থেকেই এর জন্ম। গানের কথায় থাকে প্রেম, বিচ্ছেদ আর ফেলে আসা ঘরের জন্য হাহাকার।
যেমন ১৯৪০ সালে বায়েক নিওনসওলের ক্লাসিক গান 'দ্য সোরো অফ আ ট্রাভেলার'-এর কথায় আছে: 'অর্ধেক জীবন কেটে গেল, দশ বছর ধরে বিদেশ-বিভূঁইয়ে খালি পায়ে হাঁটছি; এই বুকে দুঃখ জমেছে পাহাড়সম; গোধূলি নামলেই মনে পড়ে জন্মভূমি; চোখের জলে স্বপ্ন খুঁজি।'
সংগীতের দিক থেকে ট্রটে মাইনর স্কেল এবং 'কেওকগি' নামের বিশেষ এক গায়কী ব্যবহার করা হয়। এতে সুর বাঁকিয়ে আবেগের গভীরতা বাড়ানো হয়।
নাম জিন এবং না হুন-আ ছিলেন কোরিয়ার প্রথম পপ আইডল। ১৯৬০-এর দশক থেকে ৭০-এর দশক পর্যন্ত তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ট্রটকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তাদের ভক্তরা শিল্পীদের মঞ্চের লড়াইকে বাস্তব জীবনেও টেনে এনেছিল।
কিন্তু সেই স্বর্ণযুগ হারিয়ে গিয়েছিল। তরুণরা একে সেকেলে ভাবত। শ্রোতা বলতে ছিলেন শুধু বয়স্করা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রট নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এর পেছনে আছে রিয়্যালিটি শো-স্টাইলের ট্রট অডিশন প্রোগ্রামগুলো। সেখানে হাজার হাজার তরুণ শিল্পী তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসছেন।
এদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ৩৪ বছর বয়সী লিম ইয়াং-উং। ২০২০ সালে তিনি ১৭ হাজার প্রতিযোগীকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। এখন তিনি কোরিয়ার ঘরে ঘরে পরিচিত নাম।
২০২৪ সালে তিনি সিউলের ওয়ার্ল্ড কাপ স্টেডিয়ামে একক কনসার্ট করেছেন। সাই (গ্যাংনাম স্টাইল খ্যাত), বিগ ব্যাং বা সেভেনটিনের মতো কে-পপ সুপারস্টারদের কাতারে তিনি পৌঁছে গেছেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, কিশোর-তরুণরা কি ট্রটের সেই গভীর আবেগ ধারণ করতে পারছে? বাজার যা দিচ্ছে আর চাহিদার মধ্যে একটা ফারাক তৈরি হচ্ছে। কারণ বয়স্ক শ্রোতারাই মূলত এর প্রধান ভোক্তা।
জং মিনজে বলেন, 'তরুণ প্রতিভা থাকলেও ২০০০ সালের ওহ মাই! বা ব্যাটারি অফ লাভ-এর মতো মেগাহিট গান এখন আর হচ্ছে না।'
লিম ইয়াং-উং অবশ্য ট্রটকে আধুনিক করেছেন। তিনি ব্যালাড আর পপ-রক মিশিয়ে গান করেন। তার সাফল্য ঈর্ষণীয় হলেও অন্যদের অবস্থা তেমন নয়।
জং ব্যাখ্যা করেন, 'ট্রটের পুরোনো শ্রোতারা কমে যাচ্ছে। তাই শিল্পীদের তরুণ ও মধ্যবয়সীদের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে হচ্ছে।'
তিনি মনে করেন, বয়স্ক ভক্তরা চলে গেলে ট্রটের জনপ্রিয়তাও কমবে। এটি হয়তো 'ক্লাসিক কে-পপ' হিসেবে সম্মানের আসনে থাকবে, কিন্তু এর ব্যাপ্তি হবে সীমিত।
এআইয়ের প্রবেশ
ঠিক এখানেই এআই কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বাজিমাৎ করছেন। কে-পপের সঙ্গে ট্রট মিশিয়ে তারা তরুণদের আকৃষ্ট করছেন। কে-পপের পালিশ করা গানের ভিড়ে তরুণরা এতে নতুন স্বাদ পাচ্ছেন।
জে পার্কের হিপহপ গান 'মোম্মে'র ভাইরাল ট্রট সংস্করণের নিচে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'আমাদের মায়েরা এটা শুনলে পাগল হয়ে যাবে।'
কিম জি-হুন নামে ২৯ বছর বয়সী এক অফিস কর্মী এআই ট্রট ক্লিপ বানিয়ে ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন। তিনি বলেন, 'আমি কে-পপের কিছু লুকানো রত্নকে নতুন আলোয় আনতে চেয়েছিলাম।'
তবে এতে আইনি ঝুঁকি আছে। এআই দিয়ে তৈরি গান ও ছবির কপিরাইট নিয়ে এখনো আইন পরিষ্কার নয়। কিম অবশ্য টাকা কামাচ্ছেন না এবং প্রয়োজনে ভিডিও সরিয়ে নিতে রাজি আছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ট্রেন্ড বেশিদিন টিকবে না। জং বলেন, 'মানুষ ট্রটকে ভালোবেসে শুনছে না, বরং প্রযুক্তির মজা নিচ্ছে।'
তবে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা ইউটিউবার 'পং মি দ্য মানি'র কাছে বিষয়টি অন্যরকম। তিনি বলেন, এই ভিডিও বানাতে গিয়ে ট্রট সম্পর্কে তার ধারণাই বদলে গেছে। আগে একে সেকেলে ভাবলেও এখন তিনি এর গভীরতা বুঝতে পারেন। কপিরাইট জটিলতায় তিনি তার এআই ক্লিপগুলো সরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, 'ট্রট শুধু সস্তা বা পুরোনো গান নয়। এর কথা আর সুরে কোরিয়ান অভিজ্ঞতার গভীর ছাপ আছে। এটিই একমাত্র আধুনিক ঘরানা যা বিংশ শতাব্দীর ঝড়ঝাপটা সামলে টিকে আছে।'
