কোরিয়ান সংস্কৃতিতে আসক্তি: ভারতে ডায়েরিতে ‘মার খাওয়ার চেয়ে মৃত্যুই ভালো’ লিখে ৩ বোনের আত্মহত্যা
দিল্লির নিকটবর্তী গাজিয়াবাদে একটি বহুতল ভবনের নবম তলা থেকে নিচে পড়ে বুধবার ভোরে ১৬, ১৪ এবং ১২ বছর বয়সী তিন বোনের মৃত্যু হয়েছে।
মেয়েদের মরদেহগুলো 'ভারত সিটি' আবাসিক কমপ্লেক্সের ভেতরে তাদের ফ্ল্যাটের শোবার ঘরের জানালার ঠিক নিচেই একে অপরের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুলিশ জানিয়েছে, তিনজনই ঘটনাস্থলে মারা গেছে।
ওই কমপ্লেক্সের একজন বাসিন্দা অরুণ কুমার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, রাত ২টার দিকে অন্য একটি টাওয়ারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাকালীন তিনি এই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি জানান, বড় বোনটি জানালার কার্নিশে পেছনের দিকে মুখ করে বসে ছিল, আর ছোট দুই বোন তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।
অরুণ কুমার বলেন, 'হঠাৎ জানালার ওপর থাকা মেয়েটি পেছনে হেলে পড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্য দুজনও নিচে ঝাঁপ দিল।'
তিনি আরও জানান, তিনি দ্রুত নিচে নেমে আসেন এবং বারবার অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে থাকেন, যা রাত সোয়া ৩টার দিকে পৌঁছায়।
পুলিশ মেয়েদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তকারীরা জানান, তিন বোন তাদের মায়ের সাথে একই ঘরে ঘুমাচ্ছিল। অপরদিকে তাদের বাবা চেতন কুমার তার ছেলের সাথে অন্য ঘরে ছিলেন
ট্রান্স-হিন্ডন এলাকার উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) নিমিশ পাতিল বলেন, 'রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে মেয়েরা পানি খাওয়ার কথা বলে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু তারা সরাসরি পূজার ঘরে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।'
তারা একটি প্লাস্টিকের টুল ব্যবহার করে জানালার কাছে পৌঁছায়। মা দরজায় ধাক্কা দিলেও তারা সাড়া দেয়নি।
পাতিল বলেন, বাবার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি জেগে ওঠার পর বড় মেয়েকে নিচে পড়ে থাকতে দেখেন এবং এর কিছুক্ষণ পরই ছোট দুজন ঝাঁপ দেয়।
পরে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মেঝেতে তিন বোনের ছোটবেলার ছবি ছড়িয়ে থাকতে দেখে। সেখান থেকে একটি মোবাইল ফোন এবং পকেট ডায়েরি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, পূজার ঘরে ঢোকার আগে মেয়েরা তাদের মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল। ফোনটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
ডায়েরি ও বাবার উদ্দেশে নোট
পুলিশ একটি এক পৃষ্ঠার হাতে লেখা নোটও উদ্ধার করেছে, যা বাবার উদ্দেশে লেখা ছিল। নোটটিতে 'স্যরি পাপা' লিখে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে এবং বড় অক্ষরে লেখা ছিল— 'রিড নাও'। সেখানে বাবাকে তাদের ডায়েরি পড়ার অনুরোধ জানানো হয়।
পুলিশ জানায়, ডায়েরি থেকে তাদের মানসিক অবস্থার করুণ চিত্র পাওয়া যায়।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, তারা কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি এতটাই আসক্ত ছিল যে কোরিয়াই তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এটি প্রায় ১৫ দিন আগের একটি ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে, যখন চেতন কুমার বড় মেয়ের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঋণে জর্জরিত স্টক ট্রেডার চেতন কুমার ওই ফোনটি বিক্রি করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাবা চেতন কুমার স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, 'ওরা কোরিয়ান গান শুনত, কোরিয়ান সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ ও কার্টুন দেখত। ওরা কোরিয়া যেতে চেয়েছিল। তিনজনই চেয়েছিল আমরা কোরিয়ান সংস্কৃতি মেনে নিই। কিন্তু আমরা রাজি না হওয়ায় তাদের আচরণ বদলে যায়। তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে নেয় এবং নিজস্ব এক জগতে বাস করতে শুরু করে।'
বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব
তদন্তকারীরা জানান, কোভিড মহামারীর পর থেকে মেয়েরা স্কুলে যেত না এবং তাদের কোনো গৃহশিক্ষকও ছিল না। তারা পাড়ার অন্য শিশুদের সাথেও মিশত না।
ঘরের দেয়ালে তারা লিখে রেখেছিল— 'আমি খুব খুব একা', 'আমার জীবন বড় নিঃসঙ্গ'।
পুলিশের মতে, তিন বোন প্রায় সব সময় একসঙ্গেই থাকত এবং সামাজিক জীবন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল। ডায়েরিতে তারা টেলিভিশন শোর চরিত্র থেকে নেওয়া নাম—মারিয়া, আলিজা ও সিন্ডি—ব্যবহার করে একে অপরকে ডাকত এবং নিজেদের আলাদা একটি জগতের বসবাসকারী হিসেবে ভাবত।
ডায়েরিতে ১৯টি বিষয়ের তালিকা রয়েছে, যেগুলো তাদের বাবা-মা পছন্দ করতেন না বলে মেয়েরা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে কোরিয়ান নাটক ও গান ছাড়াও চীনা, জাপানি, থাই, আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিনোদন রয়েছে। এছাড়া শিনচ্যান ও ডোরেমনসহ কিছু কার্টুন এবং কয়েকটি মোবাইল গেমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পারিবারিক টানাপোড়েন
ডায়েরিতে পরিবারের ভেতরের আরেকটি টানাপোড়েনের কথাও উঠে এসেছে। সেখানে চার বছর বয়সী এক ছোট বোন 'দেবু'-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মেয়েরা লিখেছে, তারা দেবুকে নিজেদের আগ্রহের সঙ্গে পরিচয় করাতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা-মা তাতে আপত্তি জানান এবং তাকে বলিউড সিনেমা দেখতে উৎসাহিত করেন। এতে তারা আরও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
ডায়েরির একটি লাইনে লেখা রয়েছে, 'তুমি তাকে বলিউডের বানিয়ে দিলে, যেটাকে আমরা জীবনের থেকেও বেশি ঘৃণা করতাম।'
ডায়েরিতে শারীরিক শাস্তির কথাও উল্লেখ রয়েছে, যদিও কার বিরুদ্ধে অভিযোগ তা স্পষ্ট নয়। একটি লাইনে লেখা, 'আমরা কি এই দুনিয়ায় এসেছি তোমাদের হাতে মার খাওয়ার জন্য?' আরেকটি লাইনে বলা হয়েছে, 'মারধরের চেয়ে মৃত্যু আমাদের জন্য ভালো।'
ডায়েরির আরেক অংশে বিয়ের প্রসঙ্গের কথাও এসেছে, তবে বিস্তারিত নয়। সেখানে লেখা, 'বিয়ের কথা উঠলেই আমাদের হৃদয়ে অশান্তি তৈরি হতো।'
পুলিশের ধারণা, ডায়েরিটি ১৪ বছর বয়সী বোনটি লিখেছিল এবং ঘটনাটির এক বা দুই দিন আগে, সম্ভবত বাবার সঙ্গে কোনো ঝগড়ার পর এটি লেখা হয়। ডায়েরিটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
চাপের মধ্যে পরিবার
পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারটির পরিস্থিতি ছিল জটিল। চেতন কুমার দাবি করেন, তিনি তিন বোনের সঙ্গে বসবাস করেন এবং তিনজনকেই বিয়ে করেছেন।
নিহত বড় মেয়ে ও একটি ছেলে তার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। নিহত দুই ছোট মেয়ে জন্ম নেয় তার প্রথম স্ত্রীর ছোট বোনের ঘরে। ডায়েরিতে উল্লেখ করা চার বছর বয়সী মেয়েটি সবচেয়ে ছোট বোনের সন্তান।
পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালের মে-তে কুমারের দুই সঙ্গী বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এ ঘটনায় তিনি নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। কয়েক দিন পর তারা ফিরে আসেন।
তদন্তকারীদের মতে, কোভিড-১৯ সময়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন কুমার এবং পরে ঋণ নিতে হয়, যা পরিবারে মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।
তদন্ত চলমান
পুলিশ জানিয়েছে, মেয়েদের আগ্রহ ও জীবনযাপন নিয়ে পরিবারে প্রায়ই ঝগড়া হতো। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত চলছে এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
নিমিশ পাতিল বলেন, 'এটি শিশুদের জড়িত একটি মর্মান্তিক ঘটনা, যেখানে একটি পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে ছিল।'
