দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: নিহত ২১, আহত ৫ বাংলাদেশি
ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির দক্ষিণ মালব্য নগর এলাকার একটি হোটেলের রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
আজ বুধবার (৩ জুন) সকালে লাগা এই আগুনে আরও ৩৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে হয়েছে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নয়া দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন একটি সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের চিকিৎসা চলছে সাকেত এলাকার ম্যাক্স হাসপাতালে এবং অন্য দুইজন সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাই কমিশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং আহতদের শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড়ভাবে নজরদারি করছে।
এনডিটিভির সূত্র মতে, আজ সকাল আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে 'ফ্লুরিশ স্টে' নামক একটি পাঁচতলা হোটেলের বেসমেন্টে অবস্থিত রেস্তোরাঁ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পাশের 'মিকাসো ইন' হোটেলেও ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাটি আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এবং শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের আধিক্যের কারণে উদ্ধারকাজে বেগ পেতে হয়।
দমকল বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের দুটি ওয়াটার ইঞ্জিন, দুটি ওয়াটার বাউজার এবং কুইক রেসপন্স টিমসহ একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রাণ বাঁচাতে জ্বলন্ত ভবন থেকে মানুষ নিচে লাফিয়ে পড়ছে। নিচে থাকা লোকজন তাদের আঘাত কমাতে রাস্তায় তোশক ও ম্যাট্রেস বিছিয়ে দেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'আমি চার থেকে ছয়জনকে কাঁচ ভেঙে ভবন থেকে লাফ দিতে দেখেছি। নিচে পড়ার পর একজনের পা ভেঙে গেছে বলে মনে হলো।'
লভকেশ বাজাজ নামক এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এই হোটেলটি হউজ রানীর সরু গলিতে অবস্থিত। ২৫টি কক্ষের এই হোটেলে আগুন লাগার সময় প্রায় ৪০ জন অতিথি অবস্থান করছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় অধিকাংশ পর্যটকই ঘুমিয়ে ছিলেন।
নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগ
এনডিটিভি জানিয়েছে, ফ্লুরিশ স্টে হোটেলটি দিল্লি সরকারের 'বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট' (বিঅ্যান্ডবি) নীতিমালার আওতায় মাত্র ৬টি রুমের লাইসেন্স পেয়েছিল। কিন্তু আইন অমান্য করে বেসমেন্টসহ হোটেলটিতে ২৫টি রুম চালানো হচ্ছিল।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের প্রধান এ কে মালিক বলেন, 'প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে হোটেলটির কোনো বৈধ ফায়ার এনওসি (অনাপত্তি সনদ) ছিল না। পাঁচতলা ভবনটির বেসমেন্টে শটার লাগানো ছিল, যা কেটে ফায়ার কর্মীদের ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। ভবনটিতে জানালা ছিল না এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ধোঁয়ায় আটকা পড়ে প্রাণহানি বাড়ে।'
শেফের বয়ানে আগুনের ভয়াবহতা
পাশের মিকাসো ইন হোটেলের শেফ কেসর সিং সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে এনডিটিভিকে বলেন, 'আমি ইলেকট্রিক স্টোভে চা বানাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। বাইরে বেরিয়ে দেখি পুরো হোটেল দাউদাউ করে জ্বলছে। আমি কোনোমতে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাই।'
প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর শোক
এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) বলা হয়, 'এই প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।'
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, 'আমি গভীরভাবে শোকাহত। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছে। দিল্লি সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে আছে এবং আহতদের সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করছে।'
