প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে দ্রুত বিচার আদালত গঠনের প্রতিশ্রুতি মোদির, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের জন্য 'দ্রুত বিচার আদালত' (ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট) গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের বিক্ষোভের মধ্যে এটিই এ বিষয়ে মোদির প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া।
বুধবার (২২ জুলাই) রাতে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন তিনি। ওই সংঘর্ষে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
মোদি লিখেছেন, 'আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়।' তিনি বলেন, 'প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপেরই অংশ এটি । যারা আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।'
উল্লেখ্য, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বুধবার রাতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় আয়োজিত বিক্ষোভে ১০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হন। 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) আন্দোলনের নেতারা ঘোষণা দেন, মে মাসে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এক মাস ধরে চলা এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এটিই তার সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের সবচেয়ে বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোও আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন অচল করে দেয়।
সোমবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করলে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে এবং লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
বুধবারও হাজারো বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে ভারতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দেন। একই সময়ে সংসদ ভবনের বাইরেও বিক্ষোভ হয়।
সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেলে আশপাশের সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের বরাতে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকজন বিক্ষোভকারী পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল ছুড়ে হামলা চালালে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
নিজেদের 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নামে পরিচয় দেওয়া এই আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে। শুরুতে এতে কয়েকশ তরুণ অংশ নিলেও পরে তা বড় আন্দোলনে রূপ নেয়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তিনি বলেন, 'এ পর্যন্ত ২৫ দিন হয়েছে। প্রয়োজন হলে ২৫ মাসও লাগুক, তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা এখান থেকে সরব না।'
বন্ধ ১৬ মেট্রো স্টেশন
নিরাপত্তাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লি ও আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন। চলতি সপ্তাহে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বড় পরিসরে মেট্রো স্টেশন বন্ধের ঘটনা।
আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার ইতোমধ্যে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে এবং তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা এবং পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছে সরকার।
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন।
রাহুল গান্ধী বলেন, 'ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না।' তিনি জানান, সংসদে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করতে বৃহস্পতিবার সকালে বিরোধী নেতারা বৈঠক করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চাকরির সংকট ও ঘন ঘন প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সিজেপির জনপ্রিয়তা তারই প্রতিফলন।
একই সঙ্গে এই আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর জন্য মোদি ও তার দল বিজেপির ওপর চাপ বাড়ানোর একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের নিজেদের অন্যতম প্রধান সমর্থকগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা বিজেপি ২০২৪ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও এরপর ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে জয় পেয়েছে।
