বছরের পর বছর নিজের ‘শক্ত ভাবমূর্তি’ গড়েছেন মোদি, তবে এখন কেন ‘জেন জি রিল’ বানাচ্ছেন ?
ভারতের 'জেন জি' -দের অনেকের কাছেই নরেন্দ্র মোদি হয়তো কোনো বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তি নন, কিন্তু সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঠিক একজন বন্ধুর মতোই তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন।
৭৫ বছর বয়সী এই নেতা—দীর্ঘদিন ধরে লিখিত ভাষণ, আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার এবং নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত উপস্থপনার মাধ্যমে নিজের একটি 'শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাবমূর্তি' গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তিনি তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ফটো ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে আরও অনানুষ্ঠানিক রূপে এসেছেন।
এক মাস আগে পর্যন্ত মোদির টাইমলাইনে কেবল মেপে মেপে তৈরি করা কনটেন্ট পোস্ট করা হতো, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে আরও অনানুষ্ঠানিক কনটেন্ট। এর মধ্যে রয়েছে 'গেট-রেডি-উইথ-মি' রিল এবং তরুণদের উদ্দেশ্যে তোলা বেশ কিছু 'সেলফি-স্টাইলের ভাষণ', যাদের তিনি 'বন্ধু' বলে সম্বোধন করছেন।
এমনকি একটি ভিডিওতে, দিল্লির একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সময় তিনি জেন জি-দের ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় বাক্যাংশ উল্লেখ করে বলেন, 'আমার বংশের মধ্যে আমিই প্রথম রকেট, চিপ এবং ড্রোন তৈরি করেছি।'
ইনস্টাগ্রামে মোদির ১০ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি অনুসারী রয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি অনুসারী থাকা রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয় পেতে সাহায্য করা সেই বিখ্যাত ডিজিটাল কৌশলে পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও, এই প্ল্যাটফর্মে মোদির বার্তার ধরণ কখনোই তার দল বা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সোশাল মিডিয়া কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না।
তবে চলতি বছর ভারতে তরুণদের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র (সিজেপি) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি ট্রোল, লাইভস্ট্রিম এবং ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এটি এতটাই শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয় যে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সিজেপি একটি কৌতুক হিসেবে শুরু হলেও, অনলাইন মনোযোগকে রাজপথের আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপে রূপান্তরিত করার এই ক্ষমতা বিজেপিকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল বলে মনে হয়।
লেখক ও বিশ্লেষক অনুরাগের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি নিজেদের প্রচার বাড়াতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক পেজ এবং এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী অনলাইন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু ভারতীয় তরুণরা কনটেন্ট ও রাজনীতিকে ভিন্নভাবে দেখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে এবং ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে এই 'জেন জি' দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোটার গোষ্ঠী হয়ে উঠবে।
তাদের মন জয় করার অর্থ হলো ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাদের কাছে পৌঁছানো, যেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে ব্যক্তিগত এবং অকৃত্রিম কনটেন্ট বেশি প্রভাব ফেলে।
এই পরিবর্তনটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় যখন মোদির পোস্টগুলো প্রথম ইনস্টাগ্রামে আসা শুরু করে। তরুণ ব্যবহারকারীরা দ্রুতই ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্যের মাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া জানায়। অনেকেই তার প্রথম সেলফি-ভিডিও রিল নিয়ে উপহাস করেছিল—যেখানে আন্দোলন চলাকালীনই তিনি তরুণদের বিক্ষোভ নিয়ে নীরবতা ভাঙেন। ভিডিওতে মোদি 'ফ্রেন্ডস' বলার পর একটি দীর্ঘ বিরতি নেন। এটি তরুনণদের নজর কাড়ে।
দ্রুতই এর বিভিন্ন সংস্করণ অনলাইনে ট্রেন্ড হতে শুরু করে। সেখানে ব্যবহারকারীরা ভিডিওর আলো ও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নিয়ে মজা করে নানাভাবে ট্রোল তৈরি করে। পরবর্তী পোস্টগুলোতে মোদির টিম সেই সমালোচনার কিছু জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে মনে হয়। তারা বিভিন্ন ক্যামেরার এঙ্গেল, পটভূমি এবং আলোকসজ্জা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে।
কিছু তরুণ ব্যবহারকারী এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলেও এর সময়সূচি নিয়ে অনেকের মনে সংশয় রয়ে গেছে। ২২ বছর বয়সী গিনি মালিয়া বুঝতে পারেন কেন বিজেপি তার বয়সী তরুণদের সাথে যুক্ত হতে চায়। তার মতে, 'হঠাৎ করে যোগাযোগ বৃদ্ধির এই সময়টি আমাদের আসলে খতিয়ে দেখা দরকার।'
তিনি আরও বলেন, 'ভিডিওগুলোতে 'জেন জি'-দের ভাষা ও ফরম্যাট ব্যবহার করার চেষ্টা করা হলেও, যেসব কারণে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই উদ্বেগগুলোর কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি।'
বিষয়টি কেবল মোদির অ্যাকাউন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজেপি-র অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেইজগুলোও তরুণ দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন ট্রোল, প্রচলিত স্ল্যাং এবং পপ-কালচারের বিষয়বস্তু ব্যবহার করা শুরু করেছে।
আন্দোলন শেষ হওয়ার পরপরই বিজেপি জিম-এ ভিডিও করা একটি রিল পোস্ট করে। এতে দেখা যায় তরুণ-তরুণীরা এবং একজন বয়স্ক ট্রেইনার যুক্তি দিচ্ছেন যে তরুণ ভারতীয়দের আন্দোলন থেকে দূরে থাকা উচিত। কিন্তু অনেকেই মন্তব্যের ঘরে এবং ভিডিওটি শেয়ার করে সেটিকে চরম 'বিব্রতকর' বলে অভিহিত করেন।
বিজেপির পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওর আবহসঙ্গীত হিসেবে নব্বই দশকের জনপ্রিয় সিটকম 'ফ্রেন্ডস'-এর একটি গানটি ব্যবহার করা হয়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'পিএম মোদি ইজ দেয়ার ফর ইউ'। 'ফ্রেন্ডস' মূলত মিলেনিয়ালদের কাছে জনপ্রিয় একটি টিভি-শো হলেও 'জেন জি'-দের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়।
মালিয়া বলেন, তার বন্ধুদের কাছে এই ভিডিওগুলো রাজনৈতিক বার্তা বা জনসংযোগের চেয়ে বরং 'কৌতুকপূর্ণ কন্টেন্ট' হিসেবেই বেশি গণ্য হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের কাছে পৌঁছানোর এই প্রচেষ্টাগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না—এমন বিষয় সম্পর্কে বিজেপিও সচেতন বলে মনে হচ্ছে। আন্দোলন চলাকালে মোদি তার সরকারের মন্ত্রীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় তৎপরতা বাড়াতে এবং তরুণদের সাথে যোগাযোগ জোরদার করতে বলেছিলেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সোশাল মিডিয়ার সক্রিয়তার ওপর একটি 'রিপোর্ট কার্ড' দেওয়া হয়েছে এবং সব প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দলটি তাদের সোশাল মিডিয়া প্রধান অমিত মালব্যকেও পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, আন্দোলন চলাকালে অনলাইনে বিজেপির তীব্র সমালোচনা হওয়া এবং সোশাল মিডিয়ার আলোচনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এই রদবদল হতে পারে।
তবে কেবল বিজেপিই তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানার চেষ্টা করছে এমন নয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রায়ই ইনস্টাগ্রামে সেলফি-স্টাইলের ভিডিও এবং অনানুষ্ঠানিক ছবি পোস্ট করে থাকেন। সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর ইনস্টাগ্রামে একটি 'আস্ক মি এনিথিং' সেশনের আয়োজন করেছিলেন তিনি। সেখানে 'আপনি ও ব্যাটম্যান কি কখনও একই রুমে একসাথে ছিলেন?'—এমন মজাদার প্রশ্নের বেশ হাস্যরসাত্মক উত্তরও দেন তিনি।
তবে ইনস্টাগ্রামে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এক জিনিস, আর সেখানে চলমান আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করা অন্য জিনিস। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বিষয়ে অধ্যাপনা করা জয়জিৎ পাল বলেন, 'বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে তাদের বার্তা জোরদার করতে এবং নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করতে 'এক্স' ও হোয়াটসঅ্যাপের সমর্থকদের ওপর নির্ভর করেছে—কিন্তু এই কৌশল ইনস্টাগ্রামে কাজ করে না।
ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মটি মূলত এমন কন্টেন্ট বেশি প্রচার করে যা ব্যবহারকারীদের বেশিক্ষণ যুক্ত রাখে, যেমন: দীর্ঘ সময় ধরে দেখা, পুনরায় দেখা (রিপ্লে), শেয়ার করা এবং মন্তব্য করা।
পাল বলেন, 'এমন রিল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, যেখানে অ্যাকাউন্টটির অনুসারী মাত্র ২০০ জন হলেও সেটিতে ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ভিউ হয়েছে। অন্যদিকে বিশাল অনুসারী থাকা সত্ত্বেও কারও পোস্ট মাত্র কয়েক হাজার ভিউ পেতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি বিজেপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তাদের কৌশল তৈরি হয়েছিল নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করে। যেখানে আজকের প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক বেশি অনুভূতি-কেন্দ্রিক।'
বিজেপির জন্য আরেকটি বড় বাধা হতে পারে কোনো ভিডিও পোস্ট করার পর তার ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। মোদির প্রথম রিলটি ৪০ কোটিরও (৪০০ মিলিয়ন) বেশি বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটি বিপুল দর্শক আকর্ষণ করলেও অনুরাগের মতে, তরুণরা এটি ব্যাঙ্গাত্মক ও উপহাসমূলকভাবে সম্পাদনা করে পুনঃশেয়ার করেছে, যা মোদির মূল উদ্দেশ্যের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে। বিজেপির জন্য এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়াটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অনুরাগ বলেন, 'ইনস্টাগ্রাম মূলত একটি ব্যঙ্গ বা উপহাস-কেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে রিল আকারে গম্ভীর রাজনৈতিক বার্তাও ট্রোলের শিকার হতে পারে।' তবে বিশেষজ্ঞরা জেন জি-দের মন জয় করার ক্ষেত্রে বিজেপির এই প্রচেষ্টাকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন। তাদের মতে, নির্বাচনে দলটির সাফল্য ইনস্টাগ্রাম কন্টেন্টের পারফরম্যান্সের চেয়ে বরং তাদের সাংগঠনিক শক্তি এবং অনুগত সমর্থকগোষ্ঠীর ওপর অনেক বেশি নির্ভর করে।
পাল বলেন, 'নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে থাকার ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটি 'জেন জি' তরুণ যদি বিজেপিকে নাও পছন্দ করে, তবুও দলটি নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।'
ভারতের রাজনীতির অন্যান্য অনেকের মতোই, দলটি আপাতত তাদের জন্য একটি নতুন অঙ্গনে পথ চলতে শিখছে। তবে পাল বিশ্বাস করেন, বিজেপি শেষ পর্যন্ত এই ক্ষেত্রটিতেও নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
প্রচারণার কাজে সোশ্যাল মিডিয়ার শুরুর দিকের ব্যবহারকারী হওয়া থেকে শুরু করে পডকাস্ট কিংবা ইনফ্লুয়েন্সারদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতো নতুন নতুন ফরম্যাট গ্রহণ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে দলটির। তিনি আরও বলেন, 'তবে এতে কিছুটা সময় লাগবে। আজ আমরা যেসব সমস্যা দেখতে পাচ্ছি, তার অর্থ হলো তাদের নতুন কিছু নিয়ম শিখে এগোতে হবে।'
