গানভরের সঙ্গে এলএনজি চুক্তি: শুরুতে চড়া দাম, দীর্ঘমেয়াদে সস্তার আশ্বাস
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পুরনো সরবরাহকারীরা এলএনজি সরবরাহ হঠাৎ কমিয়ে দেওয়ায় দেশকে এখন অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দাম চড়া, বিকল্পও সীমিত। ফলে যে কার্গো পাওয়া যাচ্ছে, তা কেনা ছাড়া খুব বেশি পথ থাকছে না বাংলাদেশের সামনে। নইলে এই কার্গো হাতছাড়া হওয়ার এবং পরে আরও বেশি দামে কেনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে কয়েক দফায় আলোচনার পর গানভর ইউএসএ এলএলসি-র সঙ্গে ১৩ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করেছে পেট্রোবাংলা। এ চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করা হবে।
তবে চুক্তিটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ক্রয়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের যে সূচক ব্যবহৃত হয়, তার পরিবর্তে এখানে বাজার-ভিত্তিক দুটি মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রথম তিন বছরে চুক্তিটি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
জাপান কোরিয়া মার্কারের (জেকেএম) সঙ্গে যুক্ত ধাপটিতে গানভরের প্রিমিয়াম বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলোর তুলনায় কম মনে হতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে যে এলনজি সরবরাহ করা হবে, তার দর নির্ধারিত হবে জেকেএম সূচকের ভিত্তিতে। ফলে বাংলাদেশকে এমন একটি বাজারের ঝুঁকির মুখে থাকতে হবে, যেখানে এলএনজির বর্তমান দর দেশের তেল-ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ।
চুক্তি অণুসারে, জেকেএম সূচকের সঙ্গে বাড়তি ০.০৮৭৫ ডলার যোগ করে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে বাংলাদেশ।
আসল মারপ্যাঁচটি এখানেই।
এই মূল্য কাঠামোটি বাংলাদেশের বিদ্যমান অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির চেয়ে আলাদা। সাধারণত দেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামের ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
একটি পৃথক ব্যবস্থার আওতায়, ২০২৮ সালের তিনটি কার্গোর মূল্য মার্কিন হেনরি হাব ফর্মুলায় নির্ধারিত হবে। এরপর ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০টি করে কার্গো সরবরাহ করা হবে, যার মূল্য নির্ধারিত হবে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ৫.২০ ডলার যোগ করে।
ভবিষ্যতে গানভরের চুক্তিটি কতটা কার্যকর হতে পারে, তা বুঝতে ১৬ অগস্টের ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম (প্রতি ব্যারেল ৮৮.৫২ ডলার), জেকেএমের দর (প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.২১ ডলার) এবং ১৭ অগস্টের হেনরি হাব প্রাকৃতিক গ্যাসের দর (প্রতি এমএমবিটিইউ ২.৭১ ডলার) তুলনা করা হয়েছে।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তেল ও গ্যাসের মূল আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি চুক্তির আওতায় এলএনজির প্রকৃত দামও পরিবর্তিত হবে।
বর্তমান মূল্যে তেল-ভিত্তিক চুক্তিগুলো এখনো অনেকটা সাশ্রয়ী
স্বল্পমেয়াদি জেকেএম-ভিত্তিক চুক্তিগুলোর প্রিমিয়ামের সঙ্গে তুলনা করলে গানভরের চুক্তিটি সুবিধাজনক মনে হতে পারে। কিন্তু দেশের তেলের সূচক-নির্ভর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।
এখানে মূল সমস্যাটি আসলে মূল্য নির্ধারণের সূচক বা বেঞ্চমার্কেই।
১৬ আগস্টের ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম (প্রতি ব্যারেল ৮৮.৫২ ডলার) বিবেচনা করলে, ব্রেন্টের অনুপাতের (স্লোপ) শতকরা হার ও প্রিমিয়ামের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি তেল-নির্ভর চুক্তিগুলোর আওতায় সরবরাহ করা এলএনজির দাম পড়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে আনুমানিক ১০.৯৩ থেকে ১২.৩২ ডলার।
বাংলাদেশের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে ৪০ কার্গো সরবরাহ করে। ১৬ আগস্টের ব্রেন্ট তেলের দর অনুযায়ী এই এলএনজির প্রতি এমএমবিটিইউতে খরচ পড়বে প্রায় ১১.৭০ ডলার।
কিন্তু 'জেকেএম প্লাস ০.০৮৭৫ ডলার' ফর্মুলায় এর দাম দাঁড়ায় প্রতি এমএমবিটিইউতে ২১.৩০ ডলার—যা প্রায় ৯.৬০ ডলার বেশি।
একইভাবে ওকিউ ট্রেডিংয়ের সঙ্গে বার্ষিক ১৬টি কার্গোর জন্য ১০ বছরের চুক্তিতে প্রচলিত ব্রেন্ট মূল্যে প্রতি এমএমবিটিইউর সম্ভাব্য খরচ দাঁড়ায় ১০.৯৩ ডলার। ফলে জেকেএম ও তেল-ভিত্তিক মূল্যের মধ্যে প্রতি এমএমবিটিইউতে ব্যবধান দাঁড়ায় ১০.৩৭ ডলার।
কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি ব্রেন্ট সূচকের আওতায় ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে বছরে ১২টি কার্গো সরবরাহ করে। ব্রেন্টের একই মূল্যে এই এলএনজির দর পড়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ১১.৭৩ ডলার, যা গানভরের জেকেএম-ভিত্তিক দরের চেয়ে ৯.৫৭ ডলার কম।
ওকিউ ট্রেডিংয়ের সঙ্গে আরেকটি ১২ বছর মেয়াদি চুক্তিতে (বছরে চারটি কার্গো সরবরাহ করবে) ব্রেন্ট ফর্মুলায় প্রতি এমএমবিটিইউর খরচ দাঁড়ায় ১২.৩২ ডলার। ফলে গানভরের জেকেএম-ভিত্তিক এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউতে ৮.৯৮ ডলার বেশি পড়বে।
এদিকে এক্সিলারেট গ্যাস ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে ১৪টি কার্গো সরবরাহ করে। তাদের ব্রেন্ট ফর্মুলায় মূল্যের সর্বোচ্চ সীমা বাঁধা আছে প্রতি এমএমবিটিইউতে ১২.১২ ডলার। ফলে গানভরের এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউতে ৯.১৮ ডলার বেশি।
এই তুলনা থেকে স্পষ্ট, বর্তমানের তেল-নির্ভর দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি ও গানভরের জেকেএম-ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে প্রতি এমএমবিটিইউতে পার্থক্য ১০.৮০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে এই সমীকরণ কেবল বর্তমান বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। কারণ ব্রেন্ট ক্রুডের ওঠানামার সঙ্গে তেল-নির্ভর দর পরিবর্তিত হয়, অন্যদিকে জেকেএম-ভিত্তিক মূল্য বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।
বিদ্যমান স্বল্পমেয়াদি চুক্তির চেয়ে গানভরের প্রিমিয়াম কম
বাংলাদেশের বর্তমান স্বল্পমেয়াদি এলএনজি চুক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বিদ্যমান জেকেএম-ভিত্তিক চুক্তিগুলোর মধ্যে গানভরের প্রস্তাবিত প্রিমিয়াম সবচেয়ে কম।
২০২৫-২৬ সালের জন্য দুই বছর মেয়াদি চুক্তিতে বছরে ১২টি কার্গো সরবরাহকারী ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড প্রতি এমএমবিটিইউতে 'জেকেএম প্লাস ০.১৫ ডলার' প্রিমিয়ামে এলএনজি বিক্রি করছে। এর বিপরীতে গানভর নিচ্ছে ০.০৮৭৫ ডলার, অর্থাৎ ওকিউয়ের চেয়ে ৫.৭৫ সেন্ট কম।
২০২৬ সালে পাঁচটি কার্গো সরবরাহের জন্য আরামকো ট্রেডিংয়ের এক বছর মেয়াদি চুক্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউতে 'জেকেএম প্লাস ০.১৪৫ ডলার'; ফলে এখানেও গানভরের প্রিমিয়াম ৫.৭৫ সেন্ট কম পড়ে। সুইজারল্যান্ডের সোকার ট্রেডিং এসএ—যা সম্প্রতি ২০২৬ সালে দুটি কার্গো সরবরাহের অনুমোদন পেয়েছে—প্রতি এমএমবিটিইউতে 'জেকেএম প্লাস ০.১২৫ ডলার' মূল্যে এলএনজি সরবরাহ করবে। ফলে তাদের চেয়ে গানভরের প্রিমিয়াম ৩.৭৫ সেন্ট কম।
প্ল্যাটস জেকেএমের প্রতি এমএমবিটিইউতে ২১.২১ ডলারের মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট প্রিমিয়াম যোগ করলে, ওকিউয়ের প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দর পড়ে প্রায় ২১.৩৬ ডলার, আরামকোর প্রায় ২১.৩৫ ডলার ও সোকারের ক্ষেত্রে প্রায় ২১.৩৪ ডলার।
একই বাজার পরিস্থিতিতে গানভরের ফর্মুলায় সরবরাহকৃত প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২১.৩০ ডলার। ফলে বিদ্যমান তিনটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির তুলনায় এটি সামান্য সাশ্রয়ী হয়।
তবে এই সুবিধাটি এসেছে কম প্রিমিয়ামের কারণে, মূল বেঞ্চমার্কের দর কম হওয়ার জন্য নয়।
চারটি চুক্তিই যেহেতু জেকেএম সূচকের সাথে যুক্ত, তাই এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত পরিবর্তিত হবে।
উদাহরণস্বরূপ, জেকেএমের দর যদি কমে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলারে নেমে এলে ওকিউয়ের এলএনজির দাম কমে দাঁড়াবে ১০.১৫ ডলার এবং গানভরের দর নেমে আসবে প্রায় ১০.০৯ ডলারে।
হেনরি হাব ধাপে গড় খরচ কমতে পারে
গানভর চুক্তির দ্বিতীয় ধাপটি মার্কিন প্রাকৃতিক গ্যাসের বেঞ্চমার্ক হেনরি হাব-এর সাথে যুক্ত।
১৭ আগস্ট এনওয়াইমেক্স হেনরি হাবের দর (প্রতি এমএমবিটিইউ ২.৭১ ডলার) অনুযায়ী, গানভরের 'হেনরি হাবের ১২১ শতাংশ প্লাস যোগ ৫.২০ ডলার' ফর্মুলায় গানভরের এলএনজির দর দাঁড়ায় প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ৮.৪৮ ডলার।
এ খাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সাল থেকে হেনরি হাবের গড় দর প্রতি এমএমবিটিইউ ৩.৪০ থেকে ৪.৩০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। সেই হিসাবে গানভরের ফর্মুলায় সরবরাহকৃত এলএনজির দর পড়বে প্রতি এমএমবিটিইউ ৯.৩১ থেকে ১০.৪০ ডলার।
এই দর বর্তমানের জেকেএম-নির্ভর দরের চেয়ে অনেকটাই কম এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান তেল-নির্ভর চুক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনীয়।
তবে হেনরি হাব ফর্মুলায় বাংলাদেশ যেসব শর্ত মেনে নিয়েছে, তা নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠছে।
কাতারএনার্জি ট্রেডিংয়ের সঙ্গে 'হেনরি হাবের ১১৫ শতাংশ প্লাস ৫.৬৬ ডলার' ফর্মুলায় চুক্তি করেছে ভারতের জিএআইএল। ১৭ আগস্টের হেনরি হাব দর (প্রতি এমএমবিটিইউ ২.৭১ ডলার) অনুযায়ী তাদের বন্দর প্রান্তে প্রতি এমএমবিটিইউর মূল্য পড়ে ৮.৭৮ ডলার।
অন্যদিকে ট্রাফিগুরা-র সঙ্গে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের চুক্তির দর 'হেনরি হাবের ১২১ সটান প্লাস ৪.৫০ ডলার'। ফলে ১৭ আগস্টের বাজারদরে তাদের মূল্য হতো প্রতি এমএমবিটিইউ ৭.৭৮ ডলার।
চীনের গুয়াংদং পার্ল রিভার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের সঙ্গে কনোকোফিলিপসের ১৫ বছর মেয়াদি এলএনজি চুক্তিও প্রায় একই ফর্মুলায় (হেনরি হাবের ১২১ শতাংশ প্লাস ৪.৫০ ডলার) হয়েছে। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দর একই, অর্থাৎ ৭.৭৮ ডলার পড়ে।
এসব চুক্তির তুলনায় গানভরের ১২১ শতাংশ স্লোপ ও ৫.২০ ডলারের প্রিমিয়াম অবেক্তাই বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ইরান যুদ্ধের আগের পর্যায়ে নেমে আসে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও গানভর এমন একটি কাঠামো আদায় করে নিয়েছে, যার মাধ্যমে ২০২৬-২০২৮ সালের চড়া বাজারে প্রথম তিন বছরের সরবরাহ এশিয়ার স্পট মূল্যের সাথে যুক্ত করে দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা।
পাশাপাশি হেনরি হাবের ক্ষেত্রে ১২১ শতাংশের মতো চড়া স্লোপও নিশ্চিত করেছে গানভ, যা প্রচলিত হেনরি হাব চুক্তিগুলোর তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি বিভাগ এই চুক্তির মধ্যে যে ইতিবাচক দিক খুঁজছে, তা ফুটে উঠেছে তাদের মূল্য সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণে। এতে বলা হয়েছে, চুক্তির প্রথম কয়েক বছরে বেশি দামের জেকেএম-নির্ভর এলএনজি ও পরের বছরগুলোতে কম দামের হেনরি হাব-নির্ভর এলএনজির সমন্বয়ের ফলে সামগ্রিক গড় ক্রয়মূল্য বাংলাদেশের বিদ্যমান কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির চেয়েও নিচে নেমে আসতে পারে।
