কে-পপ তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কোরিয়ায় পাড়ি, কিন্তু জুটল শুধুই হতাশা
বিশ্বজুড়ে কে-পপ বা কোরিয়ান পপ গানের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। আর এই সুযোগে তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ভিড় জমাচ্ছে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী।
প্রতি বছর অনেকেই এই শিল্পের অংশ হতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। এই স্বপ্নই মিয়ুকে ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ে এসেছিল।
মিয়ু তখন কিশোরী। চোখে একরাশ স্বপ্ন। সিউলের এক কে-পপ প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ছয় মাসের কোর্সের জন্য সে ৩০ লাখ ইয়েন (প্রায় ১৯,৮০০ ডলার) খরচ করে। প্রতিশ্রুতি ছিল, তাকে পেশাদার নাচ ও গান শেখানো হবে এবং বড় মিউজিক এজেন্সিগুলোতে অডিশনের সুযোগ দেওয়া হবে।
সিউলের সংগীতের জন্য পরিচিত এলাকা হংদায়ে দাঁড়িয়ে মিয়ু বিবিসিকে বলে, 'প্রতি সপ্তাহে অডিশন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা কখনোই হয়নি।'
সে অভিযোগ করে, প্রশিক্ষণের মান ছিল খুবই খারাপ। তার ওপর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার হাতে সে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আইনি কারণে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মিয়ু ও একাডেমির অন্য প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বোঝা যায়, এই শিল্পে নিয়ন্ত্রণ কতটা দুর্বল। সুযোগের প্রলোভনের আড়ালে এখানে লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি।
বিবিসি ওই একাডেমির আরও দুজন প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের একজনও একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছে। তৃতীয়জন নিজে ভুক্তভোগী না হলেও অন্যদের সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ হতে দেখেছে।
তারা সবাই জানিয়েছে, অডিশনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা কখনোই পূরণ করা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য দাবি করেছে, অডিশনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তারা জানায়, ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় ২০০ বিদেশি প্রশিক্ষণার্থী তাদের প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছে।
সাধারণত কে-পপ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো 'হাগওন' বা প্রাইভেট একাডেমি অথবা বিনোদন সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হয়। প্রাইভেট একাডেমিগুলো শিক্ষা বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কিন্তু মিয়ুর একাডেমিটি বিনোদন সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত, তাই এটি দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষআইনের আওতার বাইরে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ৫,৮০০টি এজেন্সির মধ্যে এটি একটি, যাদের ওপর খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ নেই।
একজন স্থানীয় কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো কোনো তদারকি বা পরিদর্শনের আওতায় পড়ে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান নিয়মে ট্রাভেল ও এন্টারটেইনমেন্ট এজেন্সিগুলো বিদেশিদের ভাষা ও নাচ শেখাতে পারে। তাই এই 'একাডেমি-টাইপ এজেন্সি'গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
মিয়ু এখন বলছে, 'আমি আইডল হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা প্রতারণার চেয়ে কম কিছু নয়। এখানেই আমি আমার স্বপ্নের পেছনে ছুটেছিলাম, কিন্তু এখন এটা আমার ট্রমা হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
মিয়ু মিডল স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কে-পপের ভক্ত। থাইল্যান্ডের র্যাপার ও গায়িকা লিসা, যিনি কিশোর বয়সে কোরিয়ায় এসে 'ব্ল্যাকপিঙ্ক'-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন, তার অনুপ্রেরণা ছিলেন।
আজকের কে-পপে লিসা একা নন। 'টোয়াইস' গ্রুপে তিনজন জাপানি ও একজন তাইওয়ানিজ সদস্য আছেন। 'নিউ জিন্স'-এ আছেন একজন ভিয়েতনামী-অস্ট্রেলিয়ান গায়িকা। গত বছর আত্মপ্রকাশ করা 'হার্টস টু হার্ট'-এ ইন্দোনেশিয়ার প্রথম আইডলও আছেন।
কিন্তু তাদের মতো শীর্ষে পৌঁছানো খুব কঠিন। হাতেগোনা কয়েকটি শক্তিশালী এজেন্সি এই পুরো শিল্প নিয়ন্ত্রণ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বিনোদন কোম্পানি 'হাইব' (বিটিএস-এর লেবেল) তাদের প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা প্রকাশ করে না।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গড়ে একেকটি এজেন্সিতে ২০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী থাকে। ২০২৩ সালে হাইব জানিয়েছিল, তাদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বিদেশি।
আরেক জায়ান্ট 'এসএম এন্টারটেইনমেন্ট'-এর নিজস্ব একাডেমি আছে। তারাও জানায় তাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিদেশি।
তবে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কমছে। জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ৯৬৩ জন প্রশিক্ষণার্থী ছিল, যা ২০২০ সালের ১,৮৯৫ জনের প্রায় অর্ধেক। যদিও বিদেশি প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে, তবুও তা মোট সংখ্যার তুলনায় নগণ্য।
নির্বাচন প্রক্রিয়া খুবই কঠিন। সাধারণত একজন প্রশিক্ষণার্থীর ডেবিউ বা আত্মপ্রকাশ করতে দুই বছর লাগে। এরপরও মাত্র ৬০ শতাংশ সফল হয়। বিদেশিদের জন্য ভাষা, ভিসা এবং সংযোগের বাধা আরও বেশি।
এত কিছুর পরও খ্যাতির মোহ মিয়ুর মতো অনেককে টেনে আনে। মিয়ু ও অন্য দুজন জানায়, তাদের একাডেমিতে প্রায় সবাই বিদেশি ছিল।
মিয়ু দাবি করে, সেখানে পৌঁছানোর পরপরই তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। নাচের ও গানের প্রশিক্ষণ মোটেও আশানুরূপ ছিল না।
সে জানায়, এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সব সময় তার ওপর নজর রাখতেন। তিন মাস পর তিনি তাকে বাইরে নিয়ে যান।
'তিনি আইসক্রিম কিনে দেওয়ার কথা বলে আমাকে একা এক কনভিনিয়েন্স স্টোরে নিয়ে যান। আমি যখন আইসক্রিম বাছছিলাম, তিনি আমার কোমরে হাত দিয়ে বলেন, ''গুড বডি''।'
মিয়ুর দাবি, ওই কর্মকর্তা তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলেন। একবার ফটোশ্যুটের পোশাক নিয়ে কথা বলার জন্য তাকে অফিসে ডাকেন। 'তিনি আমাকে তার কোলে বসতে বলেন। আমি কোনোমতে আর্মরেস্টে বসি। সেদিন থেকে কোনো পুরুষের গলা শুনলেই আমি ভয় পাই।'
এলিন (ছদ্মনাম) নামের আরেক সাবেক প্রশিক্ষণার্থীও একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। সে জানায়, ওই কর্মকর্তা তাকে মিটিং রুমে ডেকে দরজা বন্ধ করে দেন। কোরিয়ান শেখানোর নাম করে 'হিপ' বা কোমরের কোরিয়ান শব্দ বলার সময় তিনি তাকে স্পর্শ করেন।
'আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে বন্ধুকে মেসেজ করে দ্রুত আসতে বলি,' এলিন জানায়।
সে আরও অভিযোগ করে, ওই কর্মকর্তা তাদের ডরমেটরিতেও আসতেন। 'মাঝরাতে বাতি ঠিক করার নাম করে তিনি আসতেন। একবার আমি ঘুমাচ্ছিলাম, তখন তিনি আমার ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।'
প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী অবশ্য এসব দাবি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, 'আমাদের নিয়ম অনুযায়ী নারী কর্মী ছাড়া কেউ মেয়েদের ডরমেটরিতে ঢুকতে পারে না।'
এলিন ও মিয়ু দাবি করে, প্র্যাকটিস রুম ও ডরমেটরিতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো ছিল, যা অডিওসহ রেকর্ড করত।
'সিসিটিভি ২৪/৭ চালু ছিল। আমি এমন কোনো অনুমতি দিইনি। ওই কর্মকর্তা সিসিটিভিতে আমাদের নাচ দেখতেন এবং মন্তব্য করতেন,' এলিন বলে। 'একবার তিনি শিক্ষককে বলেছিলেন, ''এটা যথেষ্ট সেক্সি না—মেয়েদের আরও সেক্সি নাচ শেখাও''।'
কোম্পানি অবশ্য ডরমেটরিতে ঢোকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা জানায়, নিরাপত্তার স্বার্থে শুধু প্রবেশপথ ও রান্নাঘরের মতো সাধারণ জায়গায় ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল।
শেষমেশ এলিন প্রোগ্রাম ছেড়ে কোরিয়া থেকে চলে আসে।
তিনজনই বিবিসিকে জানায়, তারা প্রথমে মুখ খোলেনি কারণ তারা ভয় পাচ্ছিল এতে তাদের ক্যারিয়ারের ক্ষতি হতে পারে। তাছাড়া বাবা-মায়ের এত টাকা খরচ হওয়ার কথাও তারা ভাবতে পারছিল না। ভাষা এবং আইনি জটিলতা তো ছিলই।
এলিন শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে পুলিশ কেসটি বাদ দেয়। ওই কর্মকর্তা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এলিনের আইনজীবীরা আপিল করার কথা ভাবছেন।
সে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে কোম্পানির বিরুদ্ধে আলাদা মামলা করেছে।
এদিকে কোম্পানিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এটি দেখে এলিন ক্ষুব্ধ।
সে বলে, 'কে-পপ বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে—এর সঙ্গে দায়িত্বও আসে। আমি অন্তত আশা করি, যারা এই স্বপ্নের পেছনে ছুটছে, তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে তা করতে পারে।'
মিয়ু এখনো আইডল হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
'যখনই সময় খারাপ যেত, আমি কে-পপ শুনে নিজেকে সামলাতাম। যা-ই হোক না কেন, আমি এখনো আইডল হতে চাই।'
