বিরোধীদের আপত্তির মুখেই মহারাষ্ট্রে ধর্মান্তর বিরোধী আইন পাস, গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও হয়রানির আশঙ্কা
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের বিধানসভায় 'ধর্মীয় স্বাধীনতা বিল ২০২৬' পাস হয়েছে। সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে পাস হওয়া এই বিলে জোরপূর্বক, জালিয়াতি, প্রলোভন দেখিয়ে অথবা বিয়ের মাধ্যমে ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন এই বিল অনুযায়ী, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কাউকে অবৈধভাবে ধর্মান্তরিত করলে দোষী ব্যক্তির ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে। এছাড়া যদি কোনো নাবালক, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, নারী অথবা সংখ্যালঘু জাতি ও উপজাতিভুক্ত কাউকে ধর্মান্তরিত করা হয়, তবে ৭ বছরের জেল এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার নিয়ম রাখা হয়েছে।
একই সাথে দলগতভাবে ধর্মান্তর বা 'মাস কনভার্সন'-এর ক্ষেত্রেও ৭ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার করেন, অর্থাৎ একই অপরাধ বারবার করেন, তবে তার সাজা বেড়ে ১০ বছরের জেল এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস বলেন, 'মহারাষ্ট্রের এই প্রস্তাবিত ধর্মান্তর বিরোধী আইন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এর একমাত্র লক্ষ্য হলো জোরপূর্বক, জালিয়াতি বা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তর প্রক্রিয়া প্রতিরোধ করা।'
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ওড়িশা, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, কর্ণাটক এবং ঝাড়খণ্ডের মতো ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যে এই ধরণের আইন কার্যকর রয়েছে।
দেবেন্দ্র ফড়নবিস আরও বলেন, 'এই বিল সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালনের অধিকারকে কোনোভাবেই খর্ব করে না।'
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ধর্ম পালনের অধিকার মানে কাউকে জোরপূর্বক, ভুল তথ্য দিয়ে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করা নয়।
এর আগে সাংবাদিকদের ফড়নবিস বলেন, অনেক নারীকে প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করার পর তাদের ফেলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। জালিয়াতির মাধ্যমে এমন ধর্মান্তর রোধ করতেই এই বিল আনা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, 'বিরোধী দলগুলো ভোটব্যাংকের স্বার্থে বিষয়টিকে অহেতুক রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে বিলটি মন দিয়ে পড়লে তাদের আর কোনো আপত্তি থাকবে না।'
বিধানসভায় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মন্ত্রী আরও জানান, এই আইনের আওতায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজে অথবা তার নিকটাত্মীয়রা অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেও ব্যবস্থা নিতে পারবে। নাগরিকদের বেআইনি ধর্মান্তর থেকে রক্ষা এবং রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এই বিলের মূল উদ্দেশ্য।
তবে বিতর্কের সময় বিরোধী দলগুলো আপত্তি জানিয়ে বলে, এই আইনটি বাস্তবে বৈষম্যমূলক হতে পারে। মহা বিকাশ আঘাড়ি জোটের মধ্যেও মতভেদ দেখা যায়। শিব সেনা (ইউবিটি) বিলটির পক্ষে থাকলেও, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদ পাওয়ারপন্থী) এবং সমাজবাদী পার্টি এর বিরোধিতা করে।
শিবসেনার বিধায়ক ভাস্কর যাদব বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা এবং অবৈধ ধর্মান্তর বন্ধের লক্ষ্যে এই বিলটি সহায়ক হবে।
ভাস্কর যাদব বলেন, 'এই বিলটি অত্যন্ত ব্যাপক এবং বিভিন্ন গুজব বা ভুল ধারণা থাকা সত্ত্বেও এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে আনা হয়নি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ধর্মের অপব্যবহার রোধ করা যা ব্যক্তি বা সমাজের ক্ষতি করে।'
তিনি আরও বলেন, এই বিল সব ধর্মের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং এর লক্ষ্য হলো ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি বা প্রলোভন বন্ধ করা। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৫৬ সালে ড. বি আর আম্বেদকরের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেটি ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং কোনো চাপ ছাড়াই।
যাদব জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি ধর্মেই কিছু ক্ষতিকর প্রথা থাকে যা মানবাধিকারকে খর্ব করে এবং এই বিলের মাধ্যমে সেই প্রথাগুলোকে আইনিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে অধিকাংশ বিরোধী বিধায়ক বিলটিকে আলোচনার জন্য বিধানসভার একটি যৌথ বাছাই কমিটির কাছে পাঠানোর দাবি জানান।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ ভোয়ার বলেন, প্রস্তাবিত আইনটির লক্ষ্য হলো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে জালিয়াতি, জোরপূর্বক বা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তর প্রতিরোধ করা। তিনি জানান, ধর্মান্তর যেন স্বেচ্ছায় এবং স্বচ্ছভাবে হয় তা নিশ্চিত করতেই এই বিল।
বিলের একটি বিশেষ ধারা নিয়ে কিছু সদস্য আপত্তি তুলেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে—কেউ ধর্ম পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে ৬০ দিন আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। এর জবাবে মন্ত্রী বলেন, 'এই বিধানের উদ্দেশ্য কেবল এটি যাচাই করা যে ধর্মান্তরটি কোনো প্রলোভন বা চাপের মুখে নয় বরং স্বেচ্ছায় হচ্ছে।'
তিনি দাবি করেন, এই প্রক্রিয়া ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য নয়, বরং স্বচ্ছতা ও সুরক্ষার জন্য আনা হয়েছে। এছাড়া ধর্মান্তরের ২১ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে, যা না করলে ওই ধর্মান্তর অবৈধ বলে গণ্য হতে পারে।
মন্ত্রী আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিজে পুলিশের কাছে যাওয়ার অবস্থায় থাকেন না, তাই আত্মীয় বা পরিচিতদের অভিযোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, প্রাপ্তবয়স্কদের ধর্ম পরিবর্তনের অধিকারে এটি বাধা দেবে না। বিশেষ করে নারী, তফশিলি জাতি, উপজাতি এবং নাবালকদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই এই আইন করা হয়েছে।
বিলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—যদি অবৈধ ধর্মান্তরের ভিত্তিতে বিয়ে হয় এবং কোনো সন্তান জন্ম নেয়, তবে সেই সন্তান তার মায়ের আগের ধর্ম (ধর্মান্তরের আগের ধর্ম) অনুযায়ী পরিচিত হবে।
বিজেপির অতুল ভাতকালকার সতর্ক করে বলেন, ধর্মান্তরের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের জনমিতি পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রিসাইডিং অফিসার সঞ্জয় কেলকার বিলটি পাস ঘোষণা করেন।
তবে বিরোধী দলের নীতিন রাউতসহ অন্য বিধায়করা এই আইনের অপব্যবহার এবং তথাকথিত 'ধর্ম রক্ষাকারীদের' দৌরাত্ম্য বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কংগ্রেস বিধায়ক আসলাম শেখ বলেন, এই বিলের মূল চেতনা সংবিধান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সমাজবাদী পার্টির আবু আসিম আজমি এবং রইস শেখও বিলটির তীব্র বিরোধিতা করেন। রইস শেখ বলেন, এই বিল সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব করে। তার মতে, মহারাষ্ট্র একটি প্রগতিশীল রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও এই বিলটি উল্টো পথে হাঁটার নামান্তর।
