জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতে শোধনের পরিকল্পনা বাংলাদেশের
বাংলাদেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতে শোধন করে তা দেশে আমদানির লক্ষ্যে একটি চুক্তির পথে এগোচ্ছে। কর্মকর্তারা এটিকে জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের জরুরি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছেন।
ইরান যুদ্ধঘটিত অস্থিরতার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনও অস্থির রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই ঘটনায় বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) ভারতে শোধনের পাশাপাশি সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও নতুন একটি উদ্যোগ খতিয়ে দেখছে। এর আওতায় দেশটির রিফাইনারিগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল শোধন, এলপিজি টার্মিনাল স্থাপন এবং এলপিজি ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে কর্মকর্তারা জানান, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ঘিরে এই দ্বিমুখী কৌশল মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমানো এবং দেশের নিজস্ব শোধন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের অংশ। তারা আশা করছেন, বিদেশি শোধন সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
ভারতে রাশিয়ার তেল শোধনের পরিকল্পনা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা আনুষ্ঠানিক নথি অনুযায়ী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে একটি ফাইল পাঠিয়েছে। এতে ভারতের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল শোধনের বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়, ভারত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে, নিজেদের রিফাইনারিতে তা শোধন করবে এবং পরিশোধিত পণ্য আবার বাংলাদেশে রপ্তানি করবে। এ ক্ষেত্রে ক্রুড অয়েল আমদানি ব্যয়, পরিশোধনের চার্জ এবং পরিবহন খরচ—বাংলাদেশ বহন করবে।
কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা সামাল দিতে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ জরুরি। ভারত ইতোমধ্যেই রাশিয়ার তেল আমদানি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে তা পরিশোধন করে, আবার রপ্তানিও করে থাকে। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থায় দেশটি কার্যকর অংশীদার হতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সীমাবদ্ধতা
চট্টগ্রামে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-এর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও এই উদ্যোগের পেছনে বড় কারণ। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রিফাইনারির বার্ষিক সক্ষমতা ১৫ লাখ টন এবং এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল শোধনের উপযোগী। ভারী রাশিয়ান ক্রুড প্রক্রিয়াকরণে এটি তুলনামূলকভাবে খুব একটা উপযুক্তও নয়।
ফলে ডিজেল, অকটেন ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করেছে ৬৬ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা।
কর্মকর্তাদের মতে, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের রিফাইনিং সক্ষমতা ব্যবহার করলে এই ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।
কৌশলগত তাগিদ
ইরান ও রাশিয়া ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই উদ্যোগ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাশিয়ার তেল রপ্তানিতে সাময়িক ছাড় দেওয়ায়—বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে এ সুযোগ কাজে লাগানোর সম্ভাবনা দেখছে।
যদিও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থির হওয়ায় এই ধরনের উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদি হওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদি হলে সেটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, "তেলের বাজার খুবই অস্থির। ভবিষ্যৎ অনুমান করা কঠিন, এমনকি দাম হঠাৎ করে ইরান যুদ্ধের আগের স্তরের নিচেও নেমে যেতে পারে। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকায় রাশিয়ান ক্রুড থেকে পরিশোধিত জ্বালানি পেলে—তা আমাদের জন্য সহায়ক হবে।"
পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিতে জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি সম্ভব হয়।
অতি-নির্ভরতার ঝুঁকি
তবে এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি মাত্র সরবরাহকারী দেশের ওপর নির্ভরতা বাড়লে ভূরাজনৈতিক সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তারা উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও মালয়েশিয়ার সরবরাহকারীরা 'ফোর্স মাজ্যুর' ঘোষণা করায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল।
এ বিষয়ে ম তামিম বলেন, "যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফোর্স মাজ্যুর প্রয়োগ খুবই স্বাভাবিক এবং অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেই এটি যুক্ত থাকে।"
ভারতের সঙ্গে ডিজেল আমদানি সহযোগিতা
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতায় যুক্ত রয়েছে। নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে ডিজেল আমদানির জন্য শিলিগুড়ি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত একটি আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন রয়েছে, যা ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশ ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল, যা চুক্তির ১ লাখ ৮০ হাজার টনের তুলনায় কম। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাকি ৬০ হাজার টন সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আমিরাতের রিফাইনারি ব্যবহারের উদ্যোগ
শেখ আহমেদ বিন ফয়সাল আল কাসিমি গ্রুপ একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল শোধন, বাংলাদেশে এলপিজি টার্মিনাল স্থাপন এবং এলপিজি, গ্যাসঅয়েল, জেট এ-১সহ বিভিন্ন জ্বালানি সরবরাহ।
গত ২ এপ্রিল গ্রুপটির চেয়ারম্যান শেখ আহমেদ বিন ফয়সাল আল কাসিমি এবং জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের মধ্যে বৈঠকের পর প্রস্তাবটি গুরুত্ব পায়।
এ প্রস্তাব যাচাইয়ে জ্বালানি বিভাগ চার সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন উন্নয়ন শাখার যুগ্মসচিব হায়াত মো. ফিরোজ।
কমিটিকে কমিটিকে রিফাইনারি ব্যবহার, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ এবং ঝুঁকিসহ—প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন দিক মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় জ্বালানি নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার সঙ্গে প্রস্তাবটির সামঞ্জস্যও মূল্যায়ন করা হবে।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষমতাও কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সুস্পষ্ট সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
