সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর ও রাজনৈতিক পোস্ট নিয়ন্ত্রণে ভারতের নতুন নিয়ম প্রস্তাব
ভারত সরকার ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে ইনফ্লুয়েন্সার ও পডকাস্টারসহ বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে।
গত সপ্তাহে দেশটির ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় কিছু সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। বর্তমানে নিবন্ধিত সংবাদ প্রকাশকদের জন্য প্রদত্ত নৈতিক নীতিমালাগুলো 'নিউজ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স' শেয়ার করা সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর আরোপ করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিক ও পডকাস্টারসহ সাধারণ ব্যবহারকারীদের সংবাদসংক্রান্ত পোস্টের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা আরও বাড়বে।
সরকার প্রস্তাব করেছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরকারি আদেশ ও নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। অন্যথায় তারা ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা বিষয়বস্তুর জন্য আইনি দায়মুক্তির সুবিধা [সেফ হারবার সুরক্ষা] হারাবে।
প্রস্তাবিত এসব সংশোধনী ডিজিটাল অধিকারকর্মী ও স্বাধীন সংবাদ নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে সরকারি সেন্সরশিপ বাধ্যতামূলক হয়ে পড়তে পারে। তারা আরও সতর্ক করে বলেছেন, সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু করা ও ভিন্নমত দমনে এসব নিয়মের অপব্যবহার হতে পারে।
সরকারের দাবি, এই সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যমান তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা আরও শক্তিশালী হবে এবং ভুয়া খবর, ঘৃণ্য বক্তব্য ও 'ডিপফেক' নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে আগামী ১৪ এপ্রিলের মধ্যে জনসাধারণের মতামত চাওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা সরকারের এই উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। ইউটিউব চ্যানেল 'দ্য দেশভক্ত'-এর পরিচালক আকাশ ব্যানার্জি বলেন, এই নিয়মগুলো ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যা অনেক নির্মাতাকে নিজে থেকেই মুখ বন্ধ রাখতে [সেলফ-সেন্সরশিপ] বাধ্য করবে।
আকাশ ব্যানার্জি বলেন, 'মজার বিষয় হলো, অনলাইনে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের অনেক আইন থাকা সত্ত্বেও দেশে ঘৃণ্য বক্তব্য এবং ফেক নিউজ কমেনি। অথচ সরকারের সমালোচনামূলক পোস্টগুলো (বিদ্রুপাত্মক হলেও) ক্রমাগত ব্লক বা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।'
তবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত মাসে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারায় জারি করা আদেশের ভিত্তিতে এক্স প্রায় এক ডজন অ্যাকাউন্ট ব্লক করে। এগুলোর বেশির ভাগই ছিল সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিদ্রূপাত্মক পোস্ট করার জন্য পরিচিত।
কুমার নয়ন নামের এক ব্যক্তির এক্স অ্যাকাউন্ট-এর অনুসারী প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার। তিনি বিবিসিকে বলেন, তার অ্যাকাউন্ট কেন ব্লক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আগে কোনো নোটিশ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আদালতের আদেশে চলতি সপ্তাহে অ্যাকাউন্টটি ফিরে পেলেও তার ১০টি পোস্ট এখনো ভারতে ব্লক রয়েছে এবং একটি সরকারি প্যানেল সেগুলো পর্যালোচনা করছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোস্টগুলোর সব কটিতেই হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিদ্রূপ করা হয়েছে অথবা তার নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে।
নয়ন প্রশ্ন তোলেন, 'বিবেকবান কোনো মানুষই বলবেন না যে এই পোস্টগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে। এগুলো কেবলই মজার কিছু পোস্ট, তাহলে সরকার কেন এগুলো সরিয়ে ফেলতে চায়?'
তিনি আরও জানান, এই আদেশকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করায় তার পরিচয় প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এটি তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, 'আমি সোশ্যাল মিডিয়ার সেই ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছি, যা মূলত বিভিন্ন হুমকি ও হয়রানি থেকে তথ্যদাতা ও সমালোচকদের রক্ষা করে।'
পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি তার বর্তমান বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে বিবিসি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে মার্কিন সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়—এমন বিষয়বস্তু বা অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলার অনুরোধের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
ডিজিটাল অধিকারকর্মী নিখিল পাহওয়ার মতে, তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালার প্রস্তাবিত এসব সংশোধন মূলত সরকারের বিদ্যমান 'গণ-সেন্সরশিপের অবকাঠামো' আরও শক্তিশালী করবে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিখিল পাহওয়া ও ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অপার গুপ্তা দেখিয়েছেন, ২০২১ সাল থেকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারাবাহিক সংশোধন কীভাবে অনলাইনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের অধিকার সংকুচিত করেছে।
তাদের মতে, ২০২১ সালের সংশোধনে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরকারি নজরদারির আওতায় আনা হয়। এরপর ২০২৫ সালের একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 'সহযোগ' পোর্টালকে আরও শক্তিশালী করা হয়। এটি এমন একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা ছাড়াই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে পারে।
ভারতে 'সহযোগ' নামের এই পোর্টালটি বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলার জন্য একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। এটি কেন্দ্রীয় সরকারকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারার অধীনে দেওয়া ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি বিধিমালা আবারও সংশোধন করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ব্লক করার নির্দেশ মানার জন্য আগে যেখানে ৩৬ ঘণ্টা সময় দেওয়া হতো, এখন তা কমিয়ে মাত্র তিন ঘণ্টা করা হয়েছে। ফলে কোনো নির্দেশের বিরুদ্ধে আইনি পর্যালোচনার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নিখিল পাহওয়া লিখেছেন, 'ভারতে নিজেদের বাজার ও ব্যবসার সুযোগ টিকিয়ে রাখতে প্ল্যাটফর্মগুলো এসব নির্দেশ নীরবে মেনে নেয়। কিন্তু যেসব নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে, তারা কোনো নোটিশ, শুনানি বা কারণ জানতে পারেন না। সরকারের এই প্রশাসনিক তৎপরতার গতির সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা এখন আর পাল্লা দিতে পারছে না।'
ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এস কৃষ্ণান এই বিধিমালা ও সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তার মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশিকাগুলো আইন ও সংবিধানসম্মত।
তিনি বিবিসিকে বলেন, 'সংবাদ এবং সমসাময়িক খবরের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা বা কাঠামোর প্রয়োজন ছিল', কারণ এখন শুধু নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যম নয়, সাধারণ নাগরিকেরাও নিয়মিত এ ধরনের তথ্য শেয়ার করছেন।
কুমার নয়ন বলেন, তার মতো অনেকের আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য থাকলেও সবার পক্ষে নিজের বিষয়বস্তু ফিরে পেতে এত দূর যাওয়া সম্ভব নয়। তার প্রশ্ন, 'একটি গণতন্ত্রে মানুষের নির্ভয়ে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পোস্ট করার স্বাধীনতা থাকা উচিত (অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে)। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাহলে সেখানে এটি করা কেন এত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে?'
