কে-পপ থেকে কে-ফুড: যুক্তরাজ্যে যেভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে কোরিয়ান খাবার
রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একদল ফুড-রাইটার। সবার হাতে প্লাস্টিকের গ্লাভস। বাঁধাকপির টুকরোগুলোতে লাল রঙের সস মাখানো হচ্ছে বেশ যত্ন করে।
লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে চলছে এই আয়োজন। এটি টিভি শেফ জুডি জুর ফ্ল্যাট। সেখানে শেখানো হচ্ছে কীভাবে একদম শুরু থেকে কিমচি বানাতে হয়। কোরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান এই শেফ হাতেকলমে তা শেখাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যে কোরিয়ান খাবার বললেই সবার আগে আসে কিমচির নাম। এটি ঝাঁঝালো, টক এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় মজে যাওয়া বা ফারমেন্টেড বাঁধাকপি। জুডি বলেন, এটি কোরিয়ান রান্নার ভিত্তি।
জুডি জানান, "ঐতিহ্যগতভাবে কোরিয়ানরা বছরে ৩৬৫ দিনই কিমচি খায়।" কিমচির রেসিপিগুলো পারিবারিক সম্পত্তির মতো বংশপরম্পরায় টিকে থাকে।
নখের নিচে মরিচ ঢোকা বা ট্রেনে বাড়ি ফেরার সময় শরীর থেকে গন্ধ ছড়ানো নিয়ে ক্লাসে হাসাহাসি হলেও, নিজের হাতে বানানো এক বয়াম কিমচি ফ্রিজে রাখার উত্তেজনাই আলাদা।
ওকাডো সুপারমার্কেটের নতুন কোরিয়ান ফুড সেকশন উপলক্ষে জুডি এই ক্লাসের আয়োজন করেছিলেন। ব্রিটেনে কোরিয়ান খাবার জনপ্রিয় করার জন্য তিনি পরিচিত। ব্রিটেনে কোরিয়ান খাবার এখন মূলধারায় চলে আসছে। এই আয়োজন তারই অংশ।
লন্ডনে বেড়ে ওঠা কোরিয়ানদের কাছে বিষয়টি বেশ পরিচিত। স্কুলে 'ইন্টারন্যাশনাল ডে' বা আন্তর্জাতিক দিবসে বাড়ি থেকে কোরিয়ান খাবার পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে শিক্ষকরাই তখন বেশি কৌতূহলী হতেন। তবে অনেকেই ভাবত, এটা বুঝি আরেক ধরণের চাইনিজ খাবার।
কোরিয়ান খাবার কখনো অন্য এশীয় খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেনি। এর নিজস্ব একটা পরিচয় আছে। এখন অনেক কোরিয়ান রেস্তোরাঁ খুলছে। কোরিয়া এবং ব্রিটেন—উভয় জায়গাতেই খাবারের এই পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো।
'কিমচির মতো খাবার এখন মূলধারায়'
২০০৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার 'গ্লোবাল হানসিক' বা বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান খাবার ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচার শুরু করে। তখন অনেকে এর সমালোচনা করেছিল। তারা বলছিল এর কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সরকারি গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০-এর দশকের প্রথমার্ধে বিশ্বের বড় শহরগুলোতে কোরিয়ান খাবারের পরিচিতি বেড়েছে।
এরপর এল 'কে-ওয়েভ' বা কোরিয়ান পপ কালচারের জোয়ার। খাবারের ড্রামা বা নেটফ্লিক্সের রান্নার শো—সবখানেই কোরিয়ান খাবারের জয়জয়কার। নেটফ্লিক্সের 'কুলিনারি ক্লাস ওয়ার্স' শোর দ্বিতীয় সিজন আসছে। এটি প্ল্যাটফর্মটির সেরা তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের সুপারশপগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ওয়েটরোজ-এর ওয়েবসাইটে 'কোরিয়ান বারবিকিউ' খোঁজার হার গত বছরের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। তাদের গোচুজাং পেস্টের বিক্রি বেড়েছে ৭০ শতাংশ। কিমচি এখন সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক পণ্যগুলোর একটি।
পুষ্টিবিদ ইমার লোরি বলেন, "কিমচির মতো খাবার এখন মূলধারায় চলে এসেছে। এগুলো স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ায়। আবার হজমশক্তি ও পেটের স্বাস্থ্যের জন্যও খুব ভালো।"
টিকটকে কোরিয়ান খাবার নিয়ে পোস্টের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। ২০২৩ সালে যা ছিল ১০ হাজারেরও কম, ২০২৫ সালে তা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে।
ব্রিটিশ উপাদানে কোরিয়ান স্বাদ
উত্তর লন্ডনের রেস্তোরাঁ 'ক্যালং'-এর শেফ জু ওন। তিনি ব্রিটেনে কোরিয়ান রান্নার ধরণ নিয়ে কাজ করছেন। আগে তিনি লন্ডনের হোটেলে ফরাসি, ইতালীয় বা স্প্যানিশ শেফদের সঙ্গে কাজ করতেন। একদিন সহকর্মীরা তাকে কোরিয়ান খাবার রাঁধতে বলে।
তিনি বলেন, "ওরা যখন বলল, তখন বোঝা গেল কোরিয়ান খাবার রাঁধার দক্ষতা তার নেই। একজন কোরিয়ান শেফ হিসেবে এটা ছিল খুব লজ্জাজনক।"
তিনি আবার নিজের দেশের রান্না শিখতে শুরু করেন। শুধু রেস্তোরাঁ নয়, বাড়ির রান্নার দিকেও মন দেন। কোরিয়ান রান্নার আসল ভিত্তি হলো 'জাং' বা বিশেষ ধরণের সস ও পেস্ট।
কিন্তু ব্রিটেনের বাজার আর কোরিয়ার বাজার এক নয়। তাই তাকে ব্রিটিশ উপকরণ দিয়েই কোরিয়ান স্বাদ আনার চেষ্টা করতে হয়। তিনি বলেন, "আমরা কোরিয়ান কৌশল ব্যবহার করি, কিন্তু উপকরণগুলো ব্রিটেনের।"
তিনি আরও বলেন, "কোনো উপাদানের সঙ্গে কোরিয়ান মসলা না মিললে জোর করে গোচুজাং দেওয়ার দরকার নেই। ইতালীয় রেস্তোরাঁয় যদি সব পাস্তায় একই সস দেওয়া হয়, তবে সেটা অদ্ভুত লাগবে।"
আন্তরিকতা ও সংযোগ
কোরিয়ান খাবার মানে শুধু খাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে 'জং' বা আন্তরিকতা এবং 'ইনিয়ন' বা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
ইউনসান চ্যাং একটি সাপার ক্লাব চালান। তিনি 'লোকলি' (লাভলি কোরিয়ান লাইফ) নামের প্রজেক্টের মাধ্যমে মানুষকে ঘরোয়া কোরিয়ান খাবারের অভিজ্ঞতা দেন। ইনস্টাগ্রামে তিনি একাই কোরিয়ান জীবনযাত্রাকে তুলে ধরছেন।
তার অতিথিরা কে-পপ বা ড্রামার বাইরের আসল কোরিয়ান জীবনটা দেখতে চান। তারা টেবিল সাজানো বা প্রতিদিনের খাবারের পেছনের গল্প শুনতে চান।
ইউনসান খেয়াল করেছেন, আগে ব্রিটেনে 'কিমচি বার্গার' মানে ছিল সাধারণ আচারের বার্গার। কিন্তু এখন পাব বা রেস্তোরাঁগুলো আসল কিমচি ব্যবহার করে। তিনি বলেন, "এটা দেখে মনে হয় কোরিয়ান সংস্কৃতি সত্যিই ছড়িয়ে পড়েছে।"
স্বাদের ভিন্নতা
ব্রিটিশ ইউটিউবার আরমান্ড এবং ম্যাক্স একটি ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে প্রথম কোরিয়ান খাবারের ব্যাপারে জানতে পারেন। তখন তারা স্কুলের ছাত্র ছিল। এরপর তারা কোরিয়ায় গিয়ে খাবার খেয়ে দেখেন।
ম্যাক্স বলেন, "স্বাদগুলো পরিচিত খাবারের চেয়ে একদম আলাদা ছিল। ফারমেন্টেড বাঁধাকপি বা কিমচি আগে কখনো খাওয়া হয়নি। ওটা ছিল অমৃত। কোনো কিছুর সঙ্গে এর তুলনা চলে না।"
আবার জুডির রান্নাঘরের প্রসঙ্গে আসা যাক। কিমচি তৈরি হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। জুডি ক্লাসে সবাইকে মাঝে মাঝে তা চেখে দেখতে বলেন।
সেদিন বানানো কিমচির বয়ামগুলো এখন হয়তো কারো ফ্রিজে শোভা পাচ্ছে। হয়তো পরিবারের বানানো কিমচির মতো নিখুঁত হয়নি। কিন্তু প্রতিটা পাতায় মসলা মাখানোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার মাইল দূরের রান্নাঘরের সঙ্গে একটা টান অনুভব করা যায়।
ব্রিটেনে কোরিয়ান খাবার এখনো নতুন। এটি এখনো শুক্রবার রাতের ফাস্টফুডের জায়গা নেয়নি। কিন্তু সাপার ক্লাব, ইউটিউব বা সুপারমার্কেটের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
