মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বিঘ্ন, যুক্তরাজ্যের কাছে রয়েছে মাত্র দুইদিনের গ্যাস মজুত
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় যুক্তরাজ্যে গ্যাসের মজুত মাত্র দুই দিনের সমান নেমে এসেছে। এতে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দেশটির গ্যাস সঞ্চালন অপারেটর–ন্যাশনাল গ্যাস প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের গ্যাস মজুত গত বছরের ১৮,০০০ গিগাওয়াট ঘণ্টা থেকে কমে বর্তমানে ৬,৭০০ গিগাওয়াট ঘণ্টায় নেমে এসেছে—যা চাহিদার হিসাবে মাত্র দেড় দিনের সমান।
এ ছাড়া একই পরিমাণ গ্যাস তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হিসেবে ট্যাংকে সংরক্ষিত আছে। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশ তুলনামূলকভাবে কয়েক সপ্তাহের সমপরিমাণ গ্যাস মজুত গড়ে তুলেছে।
সরবরাহ সংকটের এই পরিস্থিতিতে গ্যাস ব্যবসায়ীরা যুক্তরাজ্যের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে দিচ্ছেন, কারণ দেশটি অন্য ক্রেতাদের তুলনায় বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বর্তমানে ইউরোপের মধ্যে যুক্তরাজ্যকেই সর্বোচ্চ পাইকারি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
এদিকে বিনিয়োগ ব্যাংক- গোল্ডম্যান স্যাকস শুক্রবার রাতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহে যে ধাক্কা লেগেছে তার আকার "২০২২ সালের এপ্রিলে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার উৎপাদন কমে যাওয়ার সর্বোচ্চ ধাক্কার তুলনায় ১৭ গুণ বড়।"
ব্যাংকটি বলেছে, "যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংকট সমাধানের কোনো ইঙ্গিত না পাওয়া যায়, তাহলে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।"
তারা আরও বলেছে, "যদি মার্চজুড়ে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত থাকে, তাহলে বিশেষ করে পরিশোধিত জ্বালানির দাম ২০০৮ ও ২০২২ সালের রেকর্ড উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।"
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ এল-আরিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন দিক থেকে মূল্যবৃদ্ধির চাপের মুখে পড়বেন।
তিনি বিবিসি রেডিও ৪-এর "টুডে" অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বলেন, "আবারও আমরা দেখছি যে যুক্তরাজ্য বাইরের ধাক্কার প্রতি অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে মর্টগেজের সুদের হারও বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষকে একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে পড়তে হবে।"
তিনি বলেন, "মানুষকে শুধু জ্বালানির উচ্চমূল্যের মুখোমুখি হতে হবে না, বরং মর্টগেজের সুদের হারও বাড়বে। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে শুরু করবে।"
পণ্য বাজারসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশক প্রতিষ্ঠান- আরগুস মিডিয়ার গ্যাস মূল্য বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান নাতাশা ফিল্ডিং বলেন, ইউরোপের প্রায় সব দেশের তুলনায় যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম বেশি বেড়েছে।
তিনি বলেন, "যুক্তরাজ্যের গ্যাস হাবের মূল্য এখন ডাচ টিটিএফ (ইউরোপের প্রধান গ্যাস বাজার) মূল্যের চেয়েও বেশি—এখন থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত। অথচ এই সপ্তাহের আগে পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের দাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ে কম ছিল।"
তার মতে, এর একটি প্রধান কারণ হলো যুক্তরাজ্যে গ্যাস সংরক্ষণক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে দাম বাড়ার ঝুঁকির দিক থেকে দেশটি বেশি উন্মুক্ত।
তিনি বলেন, "আমাদের গ্যাস মজুত খুবই কম। তাই মজুত থেকে বেশি গ্যাস তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই—ফলে বিদেশ থেকেই গ্যাস আনতে হবে।"
ফিল্ডিং আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা এটাও বিবেচনায় রাখছেন যে যুক্তরাজ্যে আবহাওয়া ঠান্ডা হলে দেশটিকে অন্য ক্রেতাদের তুলনায় বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য হতে হবে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি সরবরাহ অনেকটাই "দিন এনে দিন খাওয়ার" মতো ব্যবস্থায় চলে—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এলএনজি ট্যাংকার এবং নরওয়ে থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা গ্যাসের ধারাবাহিক সরবরাহের ওপরই দেশটি নির্ভর করে ঘরবাড়ি গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য।
একসময় যুক্তরাজ্যে প্রায় ১২ দিনের সমপরিমাণ গ্যাস সংরক্ষণের সক্ষমতা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারগুলো এই ব্যবস্থার জন্য অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় এবং তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল গ্যাস-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গ্যাস সংরক্ষণাগারের মজুত আগের সক্ষমতার মাত্র ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে, আর এলএনজি ট্যাংকগুলো অর্ধেকের কিছু বেশি পূর্ণ ছিল।
সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ গ্যাস আসে নরওয়ে এবং নিজস্ব উত্তর সাগরের গ্যাসক্ষেত্র থেকে।
তিনি বলেন, "যুক্তরাজ্য বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস পায়। এর ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা পাওয়া যায়।"
তবে জ্বালানি মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো ন্যাশনাল গ্যাস-এর একটি প্রতিবেদনে গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, বিশেষ করে যখন উত্তর সাগরের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনটিতে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী জন বাটারওয়ার্থ যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড-কে সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে হলে তিনটি নতুন গ্যাস সংরক্ষণাগার অথবা এলএনজি প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ছয়টি বড় ভাসমান প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করতে হবে, যেগুলো থেকে গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা যাবে।
বাটারওয়ার্থ বলেন, মন্ত্রীদের উচিত "স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা বজায় রাখতে গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করা—বিশেষ করে যখন আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়।"
তিনি আরও বলেন, "উত্তর সাগর থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্য আমদানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, এবং আগামী বছরগুলোতে সরবরাহের ব্যবধান আরও সংকুচিত হবে। একই সময়ে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।"
নাতাশা ফিল্ডিং বলেন, গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধাক্কা হলেও প্রকৃত সংকট সম্ভবত আগামী শীতকাল পর্যন্ত দেখা যাবে না—যখন যুক্তরাজ্যকে আবার ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
তিনি বলেন, "সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আগামী শীতে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে গত গ্রীষ্মের তুলনায় অনেক বেশি এলএনজি আমদানি করতে হবে তাদের গ্যাস মজুত পুনর্গঠনের জন্য, যা বর্তমানে ২০২২ সালের পর বছরের এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম।"
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর এনার্জি সিকিউরিটি এন্ড নেট জিরো এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।
মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, "আমরা শিল্পখাতের সঙ্গে কাজ করছি যাতে ভবিষ্যতের জন্য গ্যাস ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকে এবং সরবরাহের নিরাপত্তা বজায় থাকে।"
