জেলা-উপজেলা হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সরকারের
দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। তবে এ সেবা মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার বহু রোগী চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার।
সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিভিন্ন জেলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ১০ শয্যা করে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, 'মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতালসমূহে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন (প্রথম সংশোধিত)' শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় বর্তমানে দেশের ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ৪৪টি জেলা সদর হাসপাতালে অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ক্রয় কার্যক্রম চলছে।
২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা ও জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন' শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ২২টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং ৪৪টি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হয়নি।
কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসনির্ভর হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। এর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ঢাকায়। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে এ সেবা এখনো অপ্রতুল।
২০২২ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হয়। ডায়ালাইজার পুনর্ব্যবহার করলে এ ব্যয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি সেশনে খরচ ৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি।
কিছু সরকারি হাসপাতালে ছয় মাসে ৪৮টি ডায়ালাইসিসের জন্য রোগীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সে হিসাবে প্রতি সেশনে রোগীর ব্যয় পড়ে প্রায় ৪০০ টাকা। বাকি ব্যয় সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করে।
ক্যাম্পসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ টিবিএসকে বলেন, ডায়ালাইসিস এমন একটি চিকিৎসা, যা একজন রোগীকে সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার নিতে হয়। তাই সেবাটি রোগীর বাড়ির যত কাছাকাছি থাকবে, ততই সুবিধা হবে।
তিনি বলেন, "শুধু ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করলেই হবে না; সেখানে নিয়মিত ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।"
ডা. সামাদ বলেন, একটি ডায়ালাইসিস সেন্টার পরিচালনায় প্রশিক্ষিত নেফ্রোলজিস্ট, ডায়ালাইসিস নার্স, টেকনিশিয়ান এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ কারিগরি জনবল প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এখনো প্রশিক্ষিত ডায়ালাইসিস টেকনিশিয়ানের তীব্র সংকট রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে কোনো স্বীকৃত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও নেই।
তিনি আরও বলেন, টেকসইভাবে ডায়ালাইসিস সেবা চালু রাখতে প্রতি সেশনে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে কনজিউমেবল সামগ্রী, যন্ত্র পরিচালনা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত।
"তাই শুধু কেন্দ্র স্থাপন নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের জন্যও পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক হবে এবং এতে কিডনি রোগীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন," বলেন তিনি।
