চট্টগ্রাম মেডিকেলের কিডনি বিভাগে তিনগুণ রোগী, সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মীরা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তীব্র শয্যা সংকট, 'বকশিস' বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এবং শুক্রবারে সরকারি ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকায় কিডনি রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। হাসপাতালটির কিডনি রোগ বিভাগে নির্ধারিত ৩০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ৮৬ রোগী ভর্তি আছেন।
রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা, এমনকি কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান প্রবেশপথের বাইরেও। এতে বিভাগের সক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামে কিডনি রোগী বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. নূরুল হুদা বলেন, "চট্টগ্রামে কেন রোগী বাড়ছে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। তবে আগে মফস্বল ও অনুন্নত এলাকায় কিডনি রোগ নির্ণয়ের সুযোগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কম ছিল। মানুষ আগে জানতেই পারত না যে তারা কিডনি রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে রোগ নির্ণয় সহজলভ্য হওয়ায় এবং চিকিৎসক বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালে রোগীর চাপ দেখা যাচ্ছে।"
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ ৩ কোটির বেশি মানুষ, কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে ভুগছেন। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে ৪০ হাজারের মতো মানুষের ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হলেও মাত্র ১০ হাজার মানুষ এই সুযোগ পান। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস করতে পারেন না।
আর্থিক সংকটের কারণে ডায়ালাইসিস শুরু করা ৯০ শতাংশ রোগীই তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন এবং তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে মারা যান। ডায়ালাইসিস প্রয়োজন এমন রোগীর মাত্র ১ শতাংশ কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পান।
বর্তমানে মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে কিডনি রোগ শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এর অবস্থান আরও ওপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পদে পদে 'বকশিস' ও অতিরিক্ত খরচের ভোগান্তি
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, চমেকের লোগোযুক্ত টি-শার্ট পরা একশ্রেণির ওয়ার্ডবয় ও অস্থায়ী কর্মীদের 'বকশিস' না দিলে কোনো সেবাই পাওয়া যায় না। টাকা না দিলে চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটানো হতে পারে—এমন ভয়ে বাধ্য হয়ে টাকা দিচ্ছেন স্বজনেরা।
বান্দরবান সদর থেকে আসা একজন জানান, চরম অর্থসংকটের মধ্যে তিনি বড় বোনকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দায় আছেন। তিনি বলেন, "এখানে চমেকের লোগোযুক্ত টি-শার্ট পরা মানুষজন বকশিসের নামে টাকার জন্য জোরাজুরি করে। টাকা ছাড়া কেউ কাজ করতে চায় না।"
একই ধরনের অভিযোগ করেন বোয়ালখালীর আরও এক ভুক্তভোগী। গলায় ক্যাথেটার লাগানো অবস্থায় বারান্দার বেডে শুয়ে তিনি বলেন, "হাসপাতাল থেকে ক্যাথেটার দেওয়ার কথা থাকলেও বাইরে থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। ক্যাথেটার লাগানোর সরকারি ফি ৫০০ টাকার রশিদ পেলেও ওয়ার্ডে আরও ৩০০ টাকা বকশিস দিতে হয়েছে।"
শুক্রবারে বন্ধ থাকে সরকারি ডায়ালাইসিস
খাগড়াছড়ির গুইমারা থেকে আসা এক রোগীর স্বজন জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তার এক আত্মীয়কে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় (সিরাম ক্রিয়েটিনিন ২১ দশমিক ৯১ নিয়ে) চমেকের কিডনি বিভাগে ভর্তি করা হয়। জরুরি ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে রাত সাড়ে ১২টায় রিপোর্ট এলেও শুক্রবার হওয়ায় ডায়ালাইসিস করা হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, সরকারি সরবরাহ না থাকায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিয়ে ডায়ালাইজার ফিল্টার, ক্যাথেটার, ব্লাডলাইনসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। এরপর সরকারি ফি ৫০০ টাকা দেওয়ার পর লোগোযুক্ত টি-শার্ট পরা এক ওয়ার্ডবয় শুক্রবারই ডায়ালাইসিস করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতিরিক্ত বকশিস দাবি করেন।
পরে সাংবাদিক পরিচয়ে বকশিসের কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মী আর কথা বলেননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ৩০০ টাকা বকশিস দেওয়ার পর শনিবার সকালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওই রোগীর ডায়ালাইসিস করা হয়।
চমেক হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. নূরুল হুদা তিন গুণ চাপের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী বেড সংখ্যা ৩০টি হলেও বাস্তবে প্রায়ই ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে রোগীরা করিডর বা সিঁড়ির পাশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।"
ডায়ালাইসিস সেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সিট রয়েছে মাত্র ১৮টি। যন্ত্রপাতির মেইনটেন্যান্স ও স্টাফদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের জন্য সাধারণত শুক্রবারে ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকে। তবে চরম জরুরি পরিস্থিতি হলে আমরা ডায়ালাইসিস দিয়ে থাকি।"
ক্যাথেটার সংকট ও বকশিস প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সরকারি সরবরাহ থাকলে রোগীরা বিনামূল্যে তা পান। অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অতীতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চমেকের মূল ভবনের নিচতলায় থাকা ডায়ালাইসিস সেন্টারটি পিপিপি মডেলে পরিচালিত হওয়ায় সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শুক্রবারে চলে পিপিপি সেন্টার
সরকারি ব্যবস্থাপনার ১৮ বেডের ডায়ালাইসিস সেবা শুক্রবার বন্ধ থাকলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে চমেকের পিপিপি মডেলে পরিচালিত কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারে।
সেখানে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে শুক্রবারও পুরোদমে ডায়ালাইসিস চলছিল। এই কেন্দ্রে একসঙ্গে ৩১ জন রোগী সেবা নিতে পারেন এবং প্রতিদিন চারটি শিফটে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ জন রোগী ডায়ালাইসিস করান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, "কিডনি ডায়ালাইসিস সেবার ক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভর্তি রোগীদের জরুরি সেবা সবসময় চালু থাকার নিয়ম। বৃহস্পতিবার রাতে রোগীর ডায়ালাইসিসে বিলম্বের বিষয়টি প্রশাসনিক ও কর্মভারজনিত কারণে হতে পারে।"
লোগোযুক্ত পোশাক পরা কর্মীদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, "বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি। ক্যাথেটার স্থাপনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো নিয়ম নেই। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
চমেকের তথ্যমতে, বর্তমানে নেফ্রোলজি বা কিডনি রোগ বিভাগে বিভাগীয় প্রধানসহ মোট ৩৪ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ছয়জন সহযোগী অধ্যাপক, একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন করে রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার ও ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর এবং দুজন ডায়ালাইসিস মেডিকেল অফিসার। এ ছাড়া দুজন এমডি রেসিডেন্ট এবং ১৬ জন ফেজ-বি চিকিৎসকসহ অন্য চিকিৎসকেরা এই বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করছেন।
চমেকের বাইরে চট্টগ্রাম নগরের মা ও শিশু হাসপাতালে ১১টি মেশিনের সাহায্যে প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন, যেখানে প্রথমবার ডায়ালাইসিসে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে চট্টগ্রাম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালেও এই চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, কীটনাশকযুক্ত খাদ্য এবং অনুমোদনহীন ভেষজ ওষুধ সেবন এই রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ডায়ালাইসিস ও প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।"
তিনি আরও জানান, রোগীর চাপ সামাল দিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় নির্মাণাধীন কিডনি, ক্যানসার ও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে প্রায় ২০০ শয্যার কিডনি চিকিৎসা সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
