জ্বালানি নিয়ে নৈরাজ্য চলছেই: জোড়-বিজোড় রেশনিংয়ের মতো পরিকল্পনা এখনো উপেক্ষিত
হাইলাইটস
- মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে ২৬টি চালানে দেশে এসেছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন জ্বালানি
- মালয়েশিয়া থেকে ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে গতকাল নোঙর করেছে একটি জাহাজ
- চলমান সংকটের পেছনে অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার বিষয়ে সরকারের আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও, গতকাল সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও থেমে থেমে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো ঘটনা অব্যাহত ছিল।
চাহিদা সামাল দিতে এবং পাম্পগুলোতে চাপ কমাতে বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা জোড়-বিজোড় রেশনিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব দিলেও, সেগুলো এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পাশাপাশি প্রায়শই 'তেল নেই' নোটিশ দেখতে হচ্ছে।
এই চাপের মুখে বিপিসি ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে প্রতিদিন ১৩,০৪৮ টন ডিজেল, ১,৪২২ টন অকটেন এবং ১,৫১১ টন পেট্রল বিতরণ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও খুচরা পর্যায়ে পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি।
বাস্তবে, সরবরাহ বৃদ্ধির এই সুফল পাম্পগুলোতে জ্বালানির সহজলভ্যতায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশে অপেক্ষার সময় কিছুটা কমলেও, দেশের বেশিরভাগ এলাকার গাড়িচালকদের এখনো বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।
আমদানি ও মজুতের পরিসংখ্যানে নেই ঘাটতি
বন্দর ও বিপিসি সূত্র জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ২১ এপ্রিলের পর্যন্ত ৫৩ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৬টি জাহাজে ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন জ্বালানি এসেছে।
এর মধ্যে ১৬টি জাহাজে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৫২ টন ডিজেল, ছয়টিতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭ টন ফার্নেস অয়েল, দুটিতে ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন এবং দুটিতে ২১ হাজার ২৬৬ টন জেট ফুয়েল এসেছে। তা ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজ 'হাফনিয়া চিতা' গতকাল দুপুরের দিকে বন্দরে ভিড়েছে।
দৈনিক ১২,৫০০ টন জ্বালানি তেলের গড় চাহিদা হিসেবে ৫৩ দিনে আসা ডিজেল দিয়ে ৫০ দিনের চাহিদা মেটানো যেত। মার্চ মাসের শুরুতে দেশে ১২ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। আগে থাকা মজুদ ও নতুন আসা ডিজেল দিয়ে ৬৫ দিনের চাহিদা মেটানোর কথা ছিল। তার মানে দেশে ডিজেলের মজুদের কোনও ঘাটতি ছিল না।
মার্চের শুরুতে অকটেনের মজুদ ছিল ১৮ দিনের। এর মধ্যে দৈনিক গড় চাহিদা ১,২০০ টন ধরে ৫৩ হাজার টন আমদানি ধরে মোট ৪৫ দিনের মজুত থাকার কথা। স্থানীয় রিফাইনারিগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৭০০ টন হারে আরো ৩৭,০০০ টন বা ৩০ দিনের অকটেন পাওয়ার কথা। অর্থাৎ, প্রাপ্যতা দিয়ে মোট ৯৩ দিনের চাহিদা মেটানো যেত।
অথচ, পরিসংখ্যানে উদ্বৃত্ত অবস্থা থাকা সত্ত্বেও খুচরা বা ভোক্তা-পর্যায়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত রয়েছে।
@অব্যবস্থাপনা, আতঙ্ক এবং নজরদারির অভাব
জ্বালানির এই সংকট শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চের মধ্যে। মাত্র ওই সাত দিনেই ১ লাখ ৭৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়, যা স্বাভাবিক চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি। এর ফলে দ্রুত মজুত কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে, যার পর থেকে সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। অনেক গাড়িচালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হতে হয় এবং অনেককেই জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যেতে হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও বন্দরের সূত্রমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন জ্বালানি নিয়ে ২৬টি জাহাজ চট্টগ্রামে এসেছে। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েল, অকটেন ও জেট ফুয়েলের চালানের পাশাপাশি ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৫২ টন ডিজেল-ও ছিল। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে সম্মিলিত মজুত ও আমদানি দীর্ঘ সময়ের জন্য চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট ছিল।
তা সত্ত্বেও খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি তেলের সংকট অব্যাহত থাকে এবং কর্মকর্তারা ঘাটতি কমাতে দৈনিক জ্বালানি বিতরণ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবুও ফিলিং স্টেশনগুলোতে অসম সরবরাহ, কার্যক্রমের সময়সীমা হ্রাস এবং 'তেল নেই' নোটিশ দেওয়ার খবর আসতে থাকে।
বিশ্লেষকরা এই সংকটের জন্য সরবরাহের ঘাটতির চেয়ে বিতরণ ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই বেশি দায়ী করছেন। মূল কারণ হিসেবে তারা মার্চের শুরুতে অনিয়মিত উত্তোলন, দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা এবং ডিপো ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দুর্বল নজরদারির কথা উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু জ্বালানি মজুত করে রাখা হয়েছিল, আবার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে দামের পার্থক্যের কারণে কিছু অংশ পাচারও হয়ে থাকতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই অতিরিক্ত তেল সরবরাহ ঠেকানো গেলে এতটা সংকট হতো না। তখন দাম কম থাকায় অনেকেই কিনে মজুত করেছেন। কারণ তারা জানতেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। আবার পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় দাম কম থাকায় প্রচুর পরিমাণ তেল পাচার হয়েছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম নজরদারির ঘাটতি এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অনুপস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেন, যা বিতরণে অনিয়মের সুযোগ দিয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির আগাম বার্তারও সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি মজুত করার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই অ্যাপভিত্তিক ফুয়েল ট্র্যাকিং এবং জোড়-বিজোড় নম্বর প্লেট রেশনিংয়ের মতো প্রযুক্তি ও পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করলে তা জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল করতে এবং পাম্পগুলোতে ভিড় কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখত।
