জ্বালানি সংকটের চাপ সংসারে, বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম
ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে শনিবার মধ্যরাত থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এর তাৎক্ষণিক প্রভাবে পরিবহন ভাড়া ও পণ্যের দাম বেড়েছে; দেশের পরিবহন ব্যবস্থা ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এ চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এখন প্রশ্ন হলো, এই ব্যয় বৃদ্ধি জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, নাকি অস্বাভাবিকভাবে বেশি। উদাহরণ হিসেবে পণ্য পরিবহন ভাড়া ধরা যাক। সোমবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি কাভার্ড ভ্যান ভাড়া ৩০-৪০ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে—যা শুক্রবারে ছিল ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
বগুড়া ও যশোর থেকে পিকআপ ভাড়াও ১২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৫ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। অথচ ডিজেলের দাম মাত্র ১৫ শতাংশের মতো বেড়ে লিটারপ্রতি হয়েছে ১১৫ টাকা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান সাধারণত ৮০-১০০ লিটার ডিজেল খরচ করে। সেই হিসাবে জ্বালানি খরচ বাড়ার প্রভাব ট্রিপপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ১,৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ভাড়া বেড়েছে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির নির্বাহী সভাপতি সৈয়দ মো. বখতিয়ার বলেন, "জ্বালানি ঘাটতির কারণে যানবাহনের সংকট তৈরি হয়েছে। যেগুলো চলছে, সেগুলোও বারবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে থেমে থেমে জ্বালানি নিতে গিয়ে সময় হারাচ্ছে।"
এদিকে ঢাকার পাইকারি বাজারগুলোতে এই বাড়তি খরচের প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে, এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে সামলাতে হচ্ছে বাড়তি চাপ। উদাহরণ হিসেবে ডিমের দাম ধরা যায়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই নিত্যপণ্যের দাম প্রতিপিসে ২ থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে।
তবে মগবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হালিমের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রকৃত প্রভাব ডিমপ্রতি ২০ পয়সার বেশি হওয়ার কথা নয়।
চালের বাজারেও পড়েছে সেচ ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব। গত এক সপ্তাহে প্রতিকেজি চালের দাম ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৮২ থেকে ৮৫ টাকায়—যা আগে ছিল ৭৮ টাকা। নাজিরশাইল চালের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ থেকে ৯৪ টাকা।
একইভাবে দেশি মসুর ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারেও দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিনির দাম কেজিতে ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকায় উঠেছে।
দাম বাড়তে দেখা গেছে কাঁচাবাজারেও। ঢাকার বাইরে থেকে আসা পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সবজির দাম দ্রুত বেড়েছে। বাজারে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে, পটল ও ঢেঁড়শ ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি, ঝিঙা ও চিচিঙা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শিম ও সজনে ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং করলা ও কাঁকরোল ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।
টমেটো ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে, আর পেঁপে ৬০ টাকায়। ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে কাঁচামরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। লেবুর হালি ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
মৌলভীবাজারের মশলার দোকান ঘুরে দেখা যায়, গত এক মাসে মশলার দামে পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এলাচের। গত মাসে এলাচ ৩,০০০ থেকে ৩,৬০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন ৪,৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬,০৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ১,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত।
জিরার দামও বেড়েছে। মার্চ মাসে প্রতিকেজি ৬৬০ থেকে ৭৫০ টাকা থাকলেও এখন তা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় উঠেছে। এছাড়া দারুচিনি ও লবঙ্গের দাম কেজিতে যথাক্রমে ৫০ টাকা ও ১০০ টাকা করে বেড়ে বর্তমানে ৫৬০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সাধারণ তেজপাতার দামও গত মাসের ১৮০ থেকে ২০০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এদিকে মুরগির বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। সোনালি মুরগি কেজিতে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। সরবরাহ ঘাটতি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি কেজিতে মাছের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বড় তেলাপিয়া ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং পাঙাশ ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
টেংরা ও শিং মাছ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চিংড়ি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইলিশ মাছ কেজিপ্রতি ২,২০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী খালেক উদ্দিন জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ছাড়াও হিমাগার ও প্যাকেজিংয়ের খরচ বেড়েছে।
কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, "মোকামে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে এবং পরিবহন খরচ বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে কেনা দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
