দাম বাড়লেও পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকট কাটেনি, যানবাহনের দীর্ঘ সারিও কমেনি
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার, যা আজ থেকেই কার্যকর হয়েছে। কিন্তু, দাম বাড়ানোর পরও সারাদেশের পাম্পগুলোতে মিলছে না জ্বালানি তেল। ফলে পাম্পগুলোর সামনেও অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ও কমেনি।
গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ টাকা ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪০ টাকা। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রোলের নতুন দাম হয়েছে ১৩৫ টাকা ও প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩০ টাকা।
নতুন এই দর কার্যকরের পরও সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকট ও ভোগান্তির চিত্রই উঠে এসেছে টিবিএসের প্রতিবেদকদের পাঠানো তথ্যে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিছু পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও— এখনও তা পাওয়া যাচ্ছে না বেশিরভাগ পাম্পে। রোববার (১৯ এপ্রিল) সকাল থেকেই পাম্পগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে যানবাহনের। তেলের সংকট দেখিয়ে বন্ধও রাখা হয়েছে কিছু পাম্প।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১৮টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এসব ফিলিং স্টেশনের প্রত্যেকটিতে সপ্তাহে দুই-তিনবার প্রতিবারে প্রায় ৯ হাজার লিটার পেট্রল ও অকটেন সরবরাহ করা হতো ডিপো থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির পর থেকে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ডিপো থেকে পাম্পপর্যায়ে চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা হতো না। কোনো কোনো পাম্পে সপ্তাহে একবার এবং কোনো পাম্পে ১০-১২দিন পর তেল সরবরাহ করা হতো। এতে করে পাম্পে গিয়ে তেল পেতেন না গ্রাহকরা। এর ফলে সংকটের কারণে খোলাবাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হতো জ্বালানি তেল।
এঅবস্থায় সরকারিভাবে মূল্য বৃদ্ধির পর ধারণা করা হচ্ছিল, পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম হয়তো স্বাভাবিক হবে। তাই সকাল থেকেই তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে ভিড় বাড়তে থাকে যানবাহনের। তবে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও বেশিরভাগ যানবাহন তেল পায়নি। এতে করে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে যানবাহন চালক ও মালিকদের।
জেলা শহরের কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা হান্নান মিয়া জানান, তেলের সংকটে এক সপ্তাহ ধরে তার মোটরসাইকেল ঘরে ফেলে রেখেছেন। গতকাল তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণায় ভেবেছিলেন, পাম্পে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। এজন্য পরিচিত একজনের থেকে একটু তেল ধার নিয়ে মোটরসাইকেলে নিয়ে ভাদুঘর এলাকার একটি পাম্পে যান। কিন্তু এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি বলে জানান তিনি।
সরাইল-বিশ্বরোডের ফাহাদ ফিলিং স্টেশনের সত্ত্বাধিকারী ফারহান নূর জানান, ডিপো থেকে তার পাম্পে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না, সেজন্য গ্রাহকদের তেল দিতে পারছেন না। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে- সে বিষয়েও ডিপো থেকে কিছু জানানো হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
খুলনা
খুলনাতেও তেলের দাম বাড়ার পরও জ্বালানির পাম্পগুলোতে ভিড় কমেনি। বরং অনেক স্থানে আগের তুলনায় আরও বেশি চাপ লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে, খুলনা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা ও পরিবহন যানবাহনের চালকদের উপচে পড়া ভিড়। নতুন দামে তেল বিক্রি শুরু হলেও—চালকদের মধ্যে তেমন কোনো নিরুৎসাহ দেখা যায়নি। বরং অনেকেই ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় আগেভাগেই তেল সংগ্রহ করছেন।
নগরীর ফেরীঘাট মোড়ে মেঘনা পাম্পে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেল চালক রাকিব হাসান বলেন, "দাম বাড়লেও তো চলাচল বন্ধ করা যাবে না। কাজের প্রয়োজনে তেল নিতেই হচ্ছে। তবে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।"
মাহেন্দ্রা চালক শফিকুল ইসলাম বলেন, "যাত্রী না তুললে সংসার চলবে না, তাই লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে।"
পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, "দাম বৃদ্ধির পরও বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এখনো অনেকে অতিরিক্ত তেল নিচ্ছেন, ফলে সরবরাহে চাপ আছে।"
মেঘনা পাম্পের ব্যবস্থাপক মাসুদ বলেন, "আমরা নিয়ম মেনে সরবরাহ দেওয়ার চেষ্টা করছি। রেশনিং করে প্রত্যেককে ৩০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।"
রাজশাহী
রাজশাহীতেও জ্বালানি পাম্পে তেল নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। প্রায় সব পাম্পেই দেখা গেছে একই চিত্র।
তেল পাওয়ার জন্য গ্রাহকদের কাউকে কাউকে গভীর রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। পাম্পগুলোয় নতুন মূল্য অনুযায়ী তেলের দাম নেওয়া হচ্ছে গ্রাহকদের থেকে। তবে দাম বেশি নেওয়া হলেও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।
রাজশাহী গুল-গোফুর জ্বালানি পাম্পে রোববার ভোররাত ৪টা থেকে লাইনে ছিলেন প্রশান্ত কুমার সরকার নামের এক মোটর সাইকেল চালক। দুপুর সাড়ে ১২টা বেজে গেছে তখনও তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, "৪টায় আসার পরও তার আগে থেকেই লাইনে অন্তত ৩০০ জন ছিলেন। তারা মোটামুটি তেল নিয়ে গেছেন। আমিও আর কিছুক্ষণ পর পাব আশা করি।"
গুল-গোফুর পাম্পে প্রত্যেক বাইকারকে ৭০০ টাকা করে অকটেন দিতে দেখা গেছে।
একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা খায়রুল হাসান রানা অভিযোগ করেন, "দাম বৃদ্ধি ঠিকই করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না।"
সাভার
ঢাকার সাভারেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে কমেনি গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড়।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, আজ সাভারের ৭৫ শতাংশ ফিলিং স্টেশনেই নেই অকটেন-পেট্রল। বাকি ২৫ শতাংশ পাম্পে যে অকটেন থাকার কথা জানা যায়, দুপুর নাগাদ তার কয়েকটিতেও ফুরিয়ে গেছে অকটেনের মজুদ। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে অব্যাহত রয়েছে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় এবং গাড়ির দীর্ঘ লাইন।
যদিও উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উপজেলার মোট ৬৮ শতাংশ পাম্পে ডিজেলের মজুদ রয়েছে।
পাম্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেশনিং পদ্ধতি এবং চাহিদার অনুপাতে ডিপোগুলো থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ না পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
দুপুরে সাভার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা যায়, এসব পাম্পের অধিকাংশটিতেই নেই অকটেন কিংবা পেট্রল। আশুলিয়ার সম্ভার ফিলিং স্টেশন, সাভারের লালন সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনসহ যে'কটি পাম্পে অকটেন পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই রয়েছে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় এবং যানবাহনের দীর্ঘ সারি।
গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, দাম বৃদ্ধির পরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল নিতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। এছাড়াও ৫০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না পাম্পগুলো।
রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে আশুলিয়ার সম্ভার ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে জ্বালানি নিতে আসা একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ সামসুজ্জোহা মিঠু টিবিএসকে বলেন, "সকালে ৮ থেকে ১০টি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে সাড়ে ১০টা নাগাদ এখানে এসে সিরিয়াল ধরেছি। এখন ৩টা পেরিয়ে গেছে, এখনও তেল নিতে পারিনি, আমার আগে আরও ৮০ থেকে ১০০টি মোটরসাইকেল রয়েছে।"
তিনি বলেন, "শুধু মূল্যবৃদ্ধি করে এই সংকট সামাল দেওয়া যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সব পাম্পে তেল পাওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।"
এসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে এই ব্যক্তি বলেন, "সরকার বলছে সংকট নেই, তাহলে পাম্পে তেল নেই কেন?"
আজমীর নামে আরেকজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, "দুপুর ১২টা থেকে তেলের জন্য অপেক্ষা করছি, এখনও তেল পাইনি। যে পরিমাণ চাপ, তাতে সন্ধ্যার আগে তেল নিতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।"
অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও—বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিপোগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী, সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সহসাই এই সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন পাম্প-সংশ্লিষ্টরা।
সাভারের এসআই চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "আমাদের কাছে যেটুকু অকটেন ছিল, তা দুপুরেই শেষ। কাল বুঝতে পারব আবার কখন তেল পাব। একদিন পেলে, একদিন পাচ্ছি না। সব পাম্পেরই একই অবস্থা, যার কারণে গ্রাহকদের এই চাপ একই অবস্থায় রয়েছে।"
তিনি বলেন, "আগে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সপ্তাহে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন দিতে পারতাম, এখন সেখানে পাচ্ছিই তিন ভাগের এক ভাগ। চাহিদা কিন্তু কয়েকগুণ বেড়েছে। সাড়ে ৪ হাজার লিটার তেল ৪-৫ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।"
লিমন নামে তাহসিন এন্টারপ্রাইজের (ফিলিং স্টেশন) একজন কর্মী বলেন, আমরা প্রায় এক সপ্তাহ আগে ডিজেল ও অকটেন পেয়েছিলাম। এর মধ্যে কোনো তেল পাইনি। আগামীকাল আবার ডিজেল এবং অকটেন পাওয়ার কথা।
তিনি বলেন, "চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ার কারণে গ্রাহকদের চাপ কমছে না। আগে যেখানে সাড়ে ৪ হাজার লিটার আমাদের বিক্রি হতো ৫ দিনে, এখন তা দুই দিনই চলে না।"
উপজেলা প্রশাসনের আজকের তথ্য বলছে, সাভারে মোট ৫২টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৮টিতে সিএনজি ও এলপিজি সরবরাহ করা হয়। বাকি যে পাম্পগুলো জ্বালানি তেল বিক্রি করে, তার মধ্যে আজ সকালে ১১টি পাম্পে অকটেন ছিল। এছাড়া ৩০টি পাম্পে ছিল ডিজেল।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। সমস্যা হচ্ছে প্যানিক বায়িং। আবার একই সময়ে সব পাম্পে তেল না থাকায় চাপগুলো যেসব পাম্পে তেল থাকছে, সেখানে পড়ছে। আবার দু-একটা পাম্প ঘুরে গ্রাহকরা যখন তেল না পায়, তখন তাদের মধ্যেও প্যানিক তৈরি হয়। এটিও প্রয়োজনের তুলনায় অধিক জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতার একটি কারণ।"
অন্যদিকে বর্তমানে বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলের ওপর চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, "উপজেলায় প্রচুর মিল-কারখানা। যার কারণে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে প্রায় লক্ষাধিক লিটার ডিজেলের চাহিদা তৈরি হয়। এটিও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, "যেহেতু সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে, কাজেই এখন অসাধু চক্রের অবৈধভাবে তেল মজুদের প্রবণতা কমে আসার কথা। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যে এই চাপ কমে আসবে।"
