ইরান যুদ্ধের মধ্যে ভারতে ১০ দিনে চতুর্থবার বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম
ভারতের দিল্লিতে সোমবার পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২ দশমিক ৬১ রুপি এবং ডিজেলের দাম ২ দশমিক ৭১ রুপি বাড়িয়েছে সরকারি তেল বিপণন কোম্পানিগুলো (ওএমসি)। এ নিয়ে গত দুই সপ্তাহে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৭ দশমিক ৩৫ রুপি এবং ডিজেলের দাম ৭ দশমিক ৫৩ রুপি বাড়ল। ইরান যুদ্ধের মধ্যে এ নিয়ে ভারতে ১০ দিনে চারবার বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম।
সোমবারের এই মূল্যবৃদ্ধির পর দিল্লিতে এখন লিটারপ্রতি পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১০২ দশমিক ১২ রুপি এবং ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৯৫ দশমিক ২০ রুপিতে।
গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথমবার দিল্লিতে খুচরা বাজারে পেট্রোলের দাম ১০০ রুপির ঘর ছাড়াল। এর আগে ২০২২ সালের ২১ মে শেষবার পেট্রোলের দাম ১০৫ দশমিক ৪১ রুপিতে উঠেছিল।
এদিকে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৫৪ ডলার। তবে সোমবার লেনদেনের শুরুতে এই দাম বেশ খানিকটা কমে ৯৯ দশমিক ৩৬ ডলারে নেমে আসে। মূলত পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের শিগগিরই অবসান হতে পারে—এমন আশাতেই তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। এই সংঘাত থামলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।
আরও বাড়তে পারে দাম
শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের দাম ধাপে ধাপে বাড়ানোর এই ধারা খুব শিগগিরই থামার সম্ভাবনা নেই। কারণ, সরকারি তেল কোম্পানিগুলো কেবল পেট্রোল ও ডিজেলের বর্তমান লোকসানই কমাচ্ছে না, বরং এর আগে অটো ফুয়েল এবং রান্নার গ্যাসে যে ক্ষতি হয়েছিল, সেটিও তারা এখন পুষিয়ে নিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানান, বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সরকারি তেল কোম্পানিগুলো দাম বাড়ায়নি। অথচ ওই সময় তেলের দাম হু হু করে বাড়ছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার, যা ৯ মার্চ প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়।
স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতে, চারবার দাম বাড়ানোর পর তিনটি সরকারি তেল কোম্পানির পেট্রোল ও ডিজেলে লোকসান প্রতি লিটারে ১০ রুপির নিচে নেমে এসেছে। তবে কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক প্রকাশ না করে দাবি করেছেন যে তাদের লোকসান আরও বেশি। বিশ্লেষকদের ধারণা, তারা হয়তো এলপিজি বিক্রির লোকসানও এর সঙ্গে যোগ করছে।
ধাপে ধাপে লোকসান কমাচ্ছে কোম্পানিগুলো
ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর ফলে কোম্পানিগুলোর লোকসান কমছে। গত ১৫ মে প্রথমবার দাম বাড়ানোর আগে এই তিনটি কোম্পানির দৈনিক সম্মিলিত লোকসান ছিল প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি। ১৯ মে দ্বিতীয়বার দাম বাড়ানোর পর তা কমে ৭৫০ কোটি রুপিতে দাঁড়ায়। আর সোমবারের মূল্যবৃদ্ধির পর এই লোকসান ৫০০ কোটি রুপির নিচে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে—এবং সবচেয়ে আদর্শ পরিস্থিতি হিসেবে ৭০ ডলারের কাছাকাছি স্থির না হলে পঞ্চম দফায় দাম বাড়ানোর জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ১০৩ দশমিক ৫৪ ডলারে লেনদেন শেষ করে, যা ওই দিনের হিসেবে দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। তবে এটি ১৫ মে প্রথমবার দাম বাড়ানোর সময়ের (১০৮ ডলারের ওপরে) চেয়ে কম। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার বিপরীতে ভারতে বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানো রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিক প্রমাণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে শুক্রবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রুপির মান বেড়ে প্রতি ডলার ৯৫ দশমিক ৬০ রুপিতে লেনদেন শেষ হয়। অপরিশোধিত তেলের দাম কমা এবং মুদ্রানীতিতে হস্তক্ষেপের পূর্বাভাসে রুপির এই মান বেড়েছে।
তবে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন তেল কোম্পানিগুলো বছরের প্রথম প্রান্তিকে বড় ধরনের মুনাফা করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে (সংকট শুরু হয় ১ মার্চ) পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের পুরো ধাক্কা সামলানোর পরও তিনটি ওএমসি মিলে মোট ১৯ হাজার ৪৭০ কোটি রুপি নিট মুনাফা করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের সম্মিলিত নিট মুনাফা ১৩০ শতাংশ বেড়ে ৭৭ হাজার ২৮০ কোটি ৬৫ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই মুনাফা ছিল ৩৩ হাজার ৬০১ কোটি ৫৭ লাখ রুপি।
মহানগরগুলোতে জ্বালানির নতুন দাম
সবশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর দিল্লিতে এখন পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২ দশমিক ৬১ রুপি বেড়ে ১০২ দশমিক ১২ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। আর ডিজেল ২ দশমিক ৭১ রুপি বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৫ দশমিক ২০ রুপিতে।
অন্যান্য মহানগরের মধ্যে কলকাতাতেও পেট্রোলের দাম বেড়েছে। সেখানে ২ দশমিক ৮৭ রুপি বেড়ে পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ রুপিতে। মুম্বাইয়ে ২ দশমিক ৭২ রুপি বেড়ে ১১১ দশমিক ২১ রুপি এবং চেন্নাইয়ে ২ দশমিক ৪৬ রুপি বেড়ে ১০৭ দশমিক ৭৭ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল।
অন্যদিকে, কলকাতায় লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ৯৯ দশমিক ৮২ রুপি, মুম্বাইয়ে ৯৭ দশমিক ৮৩ রুপি এবং চেন্নাইয়ে ৯৯ দশমিক ৫৫ রুপি। এই শহরগুলোতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি যথাক্রমে ২ দশমিক ৮০, ২ দশমিক ৮১ এবং ২ দশমিক ৫৭ রুপি বেড়েছে।
উল্লেখ্য, স্থানীয় কর বা শুল্কের ভিন্নতার কারণেই শহরভেদে জ্বালানির দামে এমন পার্থক্য দেখা যায়।
