মার্কিন-ইরান শান্তিচুক্তির আশায় তেলের দামে বড় পতন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে— এমন একটি চুক্তির আশা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারের সূচকও বেড়েছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি 'বেশিরভাগই সম্পন্ন' হয়েছে এবং শিগগিরই এর বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে। তবে পরদিন তিনি তার আলোচক দলকে চুক্তির বিষয়ে তাড়াহুড়া না করার আহ্বান জানান।
সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে বিশ্ববাজারের প্রধান তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯৭ দশমিক ৯০ ডলারে (৭২ দশমিক ৬৪ পাউন্ড)। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ৯৯ ডলারে।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নৌপথ আবার চালু করা হবে, যদিও তিনি এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এটি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে যেতে পারে— এমন আশায় জাপানের নিক্কেইয়ের ২২৫ শেয়ার সূচক ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৫ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে।
জাপানের মতোই প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়াও এই সংঘাতের কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ দেশ দুটি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
সরকারি ছুটির কারণে সোমবার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও আর্থিক বাজার বন্ধ রয়েছে।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে তার 'খুব ভালো আলোচনা' হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল শান্তি-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক।
ট্রাম্প বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং তালিকাভুক্ত অন্যান্য দেশের মধ্যে একটি চুক্তির বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি।'
তিনি আরও বলেন, 'চুক্তির শেষ দিকের বিষয়গুলো ও বিস্তারিত এখন আলোচনা করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তা ঘোষণা করা হবে।'
ট্রাম্প আরও জানান, শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুয়ের সঙ্গেও তার ফোনে কথা হয়েছে এবং সেই আলোচনা 'খুব ভালো' হয়েছে।
চুক্তি সম্পর্কে ট্রাম্প আর কোনো বিস্তারিত জানাননি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যেকোনো চুক্তিই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা থেকে 'অবশ্যই' বিরত রাখবে।
কিন্তু রোববার তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, 'উভয় পক্ষকেই সময় নিয়ে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। কোনো ভুলের সুযোগ নেই!'
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান কাছাকাছি এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সমঝোতা হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে 'বিরোধপূর্ণ বক্তব্য' দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
মার্চের শুরু থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্য ওঠানামা দেখা গেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছিল।
আজ অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় তা এখনো অনেক বেশি রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭০ ডলার।
তেহরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো— যেমন সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলা চালিয়েছিল।
এপ্রিলের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এমএসটি ফাইন্যানশিয়ালের জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান শল কাভনিক বলেন, 'এখন সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে কিছুটা আলোর দেখা মিলছে, যা স্বল্পমেয়াদে তেলের দামে স্বস্তি এনে দেবে।'
তবে তিনি আরও বলেন, 'এখন থেকে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি হলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব তেলের বাজার চাপের মধ্যেই থাকবে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে তেল পরিবহন শুরু করা, ক্ষতিগ্রস্ত তেল স্থাপনাগুলো মেরামত করা এবং যুদ্ধ শুরুর পর রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়া বৈশ্বিক তেলের মজুত পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগবে।'
