ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনাসদস্যদের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল—সেনা ও গোয়েন্দা রিপোর্টের দাবি
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের সেনা মোতায়েন ও ক্ষয়ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকের আকাশে দুটি রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের সংঘর্ষে ৬ জন এবং কুয়েতে একটি মার্কিন কমান্ড পোস্টে ইরানের ড্রোন হামলায় আরও ৬ জন নিহত হন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই প্রাণহানিগুলোকে 'দুর্ঘটনা' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। ইরাকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনাটিকে তারা 'বন্ধুসুলভ আকাশসীমায়' দুর্ঘটনা বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে কুয়েতে হামলার পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানি ড্রোনটিকে 'স্কুইর্টার' বলে উল্লেখ করেন, যা কোনোভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
তবে বেঁচে ফেরা সেনাসদস্য এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আগে থেকেই সম্ভাব্য দুর্বলতা ও শত্রু হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রতিরক্ষা দপ্তরের বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্য আটলান্টিক ও সিবিএস নিউজের সাম্প্রতিক দুটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হুমকি কমিয়ে দেখিয়েছেন এবং চিকিৎসা সহায়তার অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন। কুয়েত হামলা থেকে বেঁচে ফেরা এক সেনাসদস্য একে সরাসরি 'ব্যর্থতা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি ২০২১ সালের পর মার্কিন সেনাদের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
মেজর স্টিফেন র্যামসবটম সিবিএস নিউজকে বলেন, ১ মার্চ কুয়েত হামলার সময় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহায়তা থাকলে অন্তত একজন সেনার প্রাণ বাঁচানো যেত। তিনি বলেন, উদ্ধারকাজে 'অ্যাম্বুলেন্সের সারি' আশা করেছিলেন, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন 'নিজেরাই নিজেদের ভরসা'।
কুয়েতে নিহত সেনাসদস্যরা শুয়াইবা বন্দরের একটি লজিস্টিক সাপোর্ট ইউনিটের অংশ ছিলেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তারা যেখানে অবস্থান করছিলেন—সেই কাঠামোটি কংক্রিটের ব্যারিয়ার দিয়ে কেবল স্থলভাগের হুমকি থেকে সুরক্ষিত ছিল, কিন্তু বিমান বা ড্রোন হামলার শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঠেকানোর মতো কোনো মজবুত সুরক্ষা সেখানে ছিল না। যদিও পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, সেনা সুরক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক হামলা আসছিল, যার বেশিরভাগই আমরা প্রতিহত করেছি। মাঝে মাঝে এমন দু-একটি ঘটনা ঘটতে পারে, দুর্ভাগ্যবশত আমরা এগুলোকে বলি 'স্কুইর্টার' যা কোনোভাবে পার পেয়ে যায়। এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি একটি টেকটিক্যাল অপারেশন সেন্টারে আঘাত হেনেছে যা সুরক্ষিত ছিল, তবে এগুলো খুবই শক্তিশালী অস্ত্র।'
মেজর রামসবটম, যিনি কুয়েতের ঘাঁটিতে 'সেনাবাহিনীর ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ড'-এর সদস্য ছিলেন, তিনি এবং আরও সাতজন সেনা সদস্য সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পেন্টাগনের এই ব্যাখ্যাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় আহত সেনাদের অবস্থা প্রথমে যা বলা হয়েছিল তার চেয়ে গুরুতর ছিল। অনেকের মস্তিষ্কে আঘাত, দগ্ধ হওয়া এবং অঙ্গচ্ছেদের আশঙ্কা ছিল। আহতদের চিকিৎসার জন্য পরে বেসামরিক গাড়ি ব্যবহার করে স্থানীয় কুয়েতি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মাস্টার সার্জেন্ট অ্যান মেরি ক্যারিয়ার বলেন, 'আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কোনো প্রস্তুতিই ছিল না।'
এর দুই সপ্তাহ পর, ইরাকের পশ্চিম আনবার প্রদেশে দুটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমানের সংঘর্ষ হয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এটিকে 'বন্ধুসুলভ আকাশসীমায়' সাধারণ দুর্ঘটনা বলে দাবি করলেও 'দ্য আটলান্টিক'-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ছোঁড়া বিমান বিধ্বংসী গোলার হাত থেকে বাঁচতে গিয়েই বিমান দুটি সংঘর্ষের মুখে পড়েছিল। বিমানবাহিনীর তদন্তে এটিকে একটি 'এড়ানো সম্ভব ছিল এমন দুর্ঘটনা' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আটলান্টিককে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পেন্টাগন দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রশ্নের জবাবে সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, 'কেসি-১৩৫ হারানোর ঘটনা শত্রুপক্ষ বা বন্ধুসুলভ গুলির কারণে হয়নি।'
তবে প্রতিবেদনে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কোনো মন্তব্য করেনি।
দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগেই হেগসেথ ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের 'সম্পূর্ণ আকাশ আধিপত্যের' দাবি করেছিলেন।
যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগও উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক হতাহত, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হুমকি কমিয়ে দেখানো বা অস্বীকার করা।
মার্কিন হামলায় ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও সামরিক কর্মকর্তারা অস্বীকার করেছেন বা তদন্তে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত সপ্তাহে কংগ্রেসে সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, মার্কিন বোমা হামলায় ইরানের ২২টি স্কুল ও ১৭টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ার খবরের পক্ষে 'কোনো প্রমাণ' নেই। তবে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক সংস্থা এয়ারওয়ার্স অন্তত ৩০০টি বেসামরিক হতাহতের ঘটনার তথ্য শনাক্ত করেছে।
কুপারের এই বক্তব্য এমন সময়ে এল যার দুই মাস আগে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গিয়েছিল যে, মার্কিন হামলায় ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ১৫০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই তদন্তের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো অস্পষ্ট।
৪০টিরও বেশি মার্কিন বিমান ধ্বংস
পেন্টাগন প্রথমে জানিয়েছিল যে, মার্চে সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে হামলায় তাদের একটি প্রধান নজরদারি বিমান 'আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত' হয়েছে। তবে পরবর্তীতে কংগ্রেসনাল রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বিমানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের ১৩ মে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টিরও বেশি সামরিক বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৫ ফাইটার জেট, এফ-৩৫ লাইটনিং, ড্রোন এবং উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার।
যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছেই। আহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে এবং কংগ্রেস থেকে জরুরি তহবিল না পেলে বাজেট সংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
গত মাসে পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানায়, যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে ডেমোক্র্যাট নেতারা মনে করেন প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই হিসাব বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে।
তবুও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার 'বিজয়' দাবি করে আসছেন এবং যুদ্ধের ব্যয় ও অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কংগ্রেস সদস্য ও সংবাদমাধ্যমকে সমালোচনা করছেন।
কংগ্রেসে ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কড়া ভাষায় সমালোচকদের আক্রমণ করে বলেন, 'এই মুহূর্তে আমরা যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছি, তা হলো কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকানদের বেপরোয়া, অকেজো এবং পরাজয়বাদী কথাবার্তা।'
তিনি আরও বলেন, 'এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তা আমাদের শর্তে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শর্তে নির্ধারিত হবে এবং তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব গোলাবারুদ ও সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।'
