অন্ধকার ঘুচিয়ে মূলধারায় ফেরার স্বপ্ন: দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর শিশুদের জন্য সরকারের সাড়ে ৪ কোটি টাকার প্রকল্প
দেশের বৃহত্তম যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া এলাকার ঝুঁকিগ্রস্ত শিশুদের অন্ধকার জীবন থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখানকার ৪৫০ শিশুকে মূলধারার সমাজে সম্পৃক্ত করতে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি এই এলাকার দেড় হাজারের বেশি যৌনকর্মীর জীবনমান উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা।
'দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর অসুবিধাগ্রস্ত শিশুদের সমাজে প্রতিষ্ঠিতকরণ' শীর্ষক এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদফতর এবং বেসরকারি সংস্থা পায়াক্ট বাংলাদেশ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর শিশুরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সহিংসতা, পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষাবঞ্চনার মধ্য দিয়ে বড় হয়। স্কুলে ভর্তি হলেও মায়ের পেশাগত পরিচয়ের কারণে তারা তীব্র সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয় এবং এক পর্যায়ে ঝরে পড়ে। এই শিশুরা যাতে অপরাধচক্র বা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে না পড়ে এবং মেয়ে শিশুরা যাতে পুনরায় এই একই পেশায় বাধ্য না হয়, সেই চক্র ভাঙাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
এ প্রকল্পের আওতায় শিশুদের জন্য সেফ হোমে আবাসন, মানসম্মত খাদ্য, পোশাক, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত টিকাদান ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া তাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
যৌনকর্মীদের দক্ষতা ও সুরক্ষা
প্রকল্পে শুধু শিশুরাই নয়, গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নেও। যৌনকর্মীরা প্রায়ই দালাল ও সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি এবং সহিংসতার শিকার হন। এছাড়া তারা মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ, প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সঞ্চয় বিষয়ে ধারণা দেওয়ার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট
এর আগে ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইউএনডিপির সহায়তায় এ এলাকায় একটি প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল। তখন ১৪৫ জন শিশুকে সেফ হোমে রেখে লালন-পালন ও শিক্ষা দেওয়া হয়। ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ২১ জন শিশুর কোনো অভিভাবক না পাওয়ায় পায়াক্ট বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে তাদের সহায়তা চালিয়ে আসছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই নতুন এই বৃহত্তর প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও সামাজিক নিরাপত্তা
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। এছাড়া সরকারের 'জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (২০১৫)'-এর লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর জন্য নেওয়া এই উদ্যোগ সেই জাতীয় কৌশলেরই একটি অংশ।
উল্লেখ্য, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌরুটের পাশে পদ্মা নদীর তীরে প্রায় ৩০ একর জমিতে অবস্থিত এই যৌনপল্লীটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম থাকায় এলাকাটি মাদক বাণিজ্য ও মানবপাচারের মতো অপরাধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। সরকারের এই নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এখানকার কয়েক হাজার মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
