‘ফ্যামিলি কার্ড’ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর, ঈদের আগেই ৮ উপজেলায় পাইলটিং
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুইদিনের মাথায়ই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছেন তারেক রহমান। যেখানে তাঁর নির্বাচনি ইশতেহার দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে, চলতি রমজানেই ৮ উপজেলায় পাইলটিং শুরু করে পর্যায়ক্রমে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তিনি।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা থেকে বের হয়ে খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, "কত দ্রুত ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম চালু করা যায়, সেটি নিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীর সাথে সভা হয়েছে। চেষ্টা চলছে, ঈদের আগেই পাইলট ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। কতটুকু করা যায়, কত দ্রুত করা যায়, সংখ্যায় কী হবে—সেটা দু-একদিন মধ্যে নির্ধারণ করা হবে। অগ্রাধিকারে থাকবে হতদরিদ্ররা। সরকার বিশেষভাবে মহিলাদের এই কার্ড দেবে এবং নগদ টাকা দেওয়া হবে। হতদরিদ্রদের পরিবারে নগদ টাকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, এজন্যই সরকার নগদ টাকার কথা ভাবছে।"
এদিকে বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ফেসবুক পেজে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বরাত দিয়েছে বলেছে, দেশে বর্তমানে চালু থাকা বিভিন্ন কার্ড ও ভাতা কর্মসূচির তুলনায়—ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। তবে বিদ্যমান কার্ড ও ভাতা কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং নতুন ফ্যামিলি কার্ড সর্বজনীনভাবে বিতরণ করা হবে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত পলিসি পেপারে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া প্রতিটি পরিবার প্রতিমাসে ২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি মসুর ডাল, ২ লিটার ভোজ্যতেল ও ১ কেজি লবণ—অথবা নগদ ২,০০০ টাকা পাবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার পণ্য দেওয়ার চেয়ে নগদ টাকা দেওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
'ফ্যামিলি কার্ড' বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদের আগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করার জন্য আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির কমিটিকে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বেধে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সরকার পরবর্তী বিস্তারিত কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নেবে।
পাইলট কর্মসূচির এলাকা
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে পাইলট প্রকল্প নেওয়ার জন্য প্রত্যেক বিভাগের একটি করে উপজেলা ঠিক করা হয়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে রংপুর বিভাগে কুড়িগ্রাম সদর; খুলনা বিভাগে শ্যামনগর; সিলেট বিভাগে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই; চট্টগ্রামের লামা উপজেলা; বরিশালের চরফ্যাশন উপজেলা; ঢাকা বিভাগের কেরাণীগঞ্জ উপজেলা, ময়মনসিংহ বিভাগের নান্দাইল উপজেলা এবং রাজশাহী বিভাগের পবা উপজেলাকে এই পাইলট কর্মসূচির জন্য নেওয়া হয়েছে।
এসব উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চলবে ৬ মাস, এতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর পুরোটাই সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে। এসব উপজেলায় দেড় লাখ উপকারভোগী রয়েছে।
উপকারভোগীদের অন্তর্ভুক্তি
ফ্যামিলি কার্ড প্রোগ্রাম হবে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো, যেখানে কার্ডটি আর্থ সামাজিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নির্বাচিত পরিবারের ১৮ বছরের বেশি বয়সী নারী প্রধান/গৃহকত্রী এর অনুকূলে ইস্যু করে নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া পরিবারবিহীন জনগোষ্ঠী যেমন এতিমখানায় বসবাসরত বাচ্চারা এর আওতায় আসবে।
স্থানীয় খাদ্যঝুড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি পরিবারের দৈনিক পুষ্টি চাহিদার ৭০ শতাংশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যাতে খাদ্যনিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয়।
বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতিহারে ৫০ লাখ পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নীতিপত্রে বলা হয়েছে, সরকার সেই অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবছে। এই সুবিধা দিতে সরকারের বছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদে এটি এক কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়া উপকারভোগীদের নতুন ফ্যামিলি কার্ড কাঠামোর অধীনে আনা হতে পারে, ফলে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো একীভূত হতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাখতে পরিবারগুলোকে— হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে এই শ্রেণিবিন্যাস হবে প্রধান মানদণ্ড। অতি দারিদ্র্যপীড়িত, দুর্যোগপ্রবণ ও বস্তি অঞ্চলে বসবাসকারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। আর প্রকৃত দরিদ্র কেউ ডিজিটাল মূল্যায়নে বাদ গেলে—কেউ যাতে বঞ্চিত না হন, সে জন্য ম্যানুয়াল আবেদন ব্যবস্থাও থাকবে।
অর্থায়ন কীভাবে হবে
নীতিপত্রে বলা হয়েছে, চলমান সমজাতীয় কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের সাথে একীভূত করলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা আসবে। এছাড়া অর্থবিভাগের পরিচালন বাজেটের থোক বরাদ্দ থেকে অর্থায়ন করা যাবে। এডিপি পুনর্বিন্যাস ও অব্যয়িত অর্থ ব্যবহার এবং মেগাপ্রকল্প বর্জন করে মানবিক উন্নয়নে ব্যয় স্থানান্তরের মাধ্যমেও অর্থায়ন জোরদার করা হবে।
বিদ্যমান সরকারি কর্মসূচি
নীতিপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ৪৫ লাখ পরিবারকে মাসে ৫ কেজি চাল, ২ লিটার সয়াবিন তেল ও ১ কেজি ডাল ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া হয়, যার বার্ষিক ব্যয় ৩,৫০০ কোটি টাকা।
এছাড়া ভিজিএফ কর্মসূচিতে দুই ঈদে ১০ কেজি চাল দেওয়া হয়। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ মানুষ বছরে ছয় মাস ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল পান, যার ব্যয় ২,৮৯৮ কোটি টাকা।
আর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভিডব্লিউবির সুবিধাভোগীদের ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। এতে ওই মন্ত্রণালয়ের খরচ হয় ১,৮৭২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে এসব কাজে সরকারের ৯,৩৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ফলে এসব কর্মসূচি বাদ দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড চালু করলে, সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকা লাগবে।
বিদ্যমান কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি ও খণ্ডিত বাস্তবায়ন
ওই পলিসি পেপারে বলা হয়েছে, দেশে ১৪০টিরও বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে, যা ২৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়ন করে। একই উদ্দেশ্যে অর্জনের জন্য কয়েকটি কর্মসূচি চলমান আছে। স্পষ্টত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
খাদ্যবাজার স্থিতিশীলতা ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
সরকার বলছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২,২০০ কিলোক্যালরি সমতুল্য খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্য মূল্যস্ফীতি থেকে রক্ষা পাবে।
এই কর্মসূচির আওতায়, প্রতিমাসে এক কোটি পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ফুড বাস্কেট সরবরাহ করা হবে, যা বাজারে খাদ্যপণ্যের ঘাটতি কমাবে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। দেশীয় কৃষিপণ্য সরকার সরাসরি কিনলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং ভবিষ্যতে আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
বিশেষজ্ঞরা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ ইতিবাচক এবং উচ্চমূল্যের বাজারে অতি দরিদ্র ও দরিদ্রদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা– সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, "ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সুবিধার ডিজাইন ও সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর। এর আগে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনেক অনিয়ম হয়েছে। যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা তাদের অনেকেই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। ফলে তালিকায় স্বচ্ছতার সাথে সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে হবে।"
পণ্য দেওয়ার চেয়ে নগদ টাকা দেওয়া ভালো বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। কারণ পণ্য বিতরণের একটি প্রশাসনিক ব্যয়ও থাকে।
তিনি বলেন, এতে বাড়তি খরচ হবে। ফলে সরকারকে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা টিবিএসকে বলেন, "হতদরিদ্র, দরিদ্র মানুষদের জন্য বর্তমানে বড় সমস্যা মূল্যষ্ফীতি। সম্প্রতি মূল্যষ্ফীতি সামান্য কমলেও হতদরিদ্র ও দরিদ্ররা তাতে স্বস্তি পায়নি। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁদের কাছে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচির গুরুত্ব অনেক। ফলে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড এধরনের জনগণকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে।"
তিনি উল্লেখ করেন, "সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের 'কনসেপ্ট' নারীকে কেন্দ্র করে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর পাশাপাশি পরিবারে নারীর গুরুত্ব বাড়বে। সম্পদে নারীর অধিকার সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা দূর করতে এই কার্ড ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে।"
তবে বিদিশা এটাও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আছে যে, এতে নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্ধারণ হয়।
"ফলে এই ফ্যামিলি কার্ডের কনসেপ্ট ইতিবাচক হলেও—এর সাফল্য নির্ভর করবে কাকে, কীভাবে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হবে তার ওপর"- যোগ করেন তিনি।
