চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা থেকে বের হতে পারছে না জনপ্রশাসন
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জনপ্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহতই রয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যে অন্তত ৭ জনকে সচিব বা সমমানের পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং একজনকে করা হয়েছে ওএসডি। আরও কয়েকজন সচিবকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে মোট ৬৫ জন সচিব রয়েছেন, যার মধ্যে ১৬ জন চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে চারজনকে সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক সচিব করা হয়েছে।
এছাড়া, সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ইমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। সাবেক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনকে করা হয়েছে ওএসডি।
জনপ্রশাসনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রাখতে সরকার এই পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন তারা। যদিও এতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের একটি অংশে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান থাকলেও সেটি নিয়মে পরিণত হলে প্রশাসনের স্বাভাবিক পদোন্নতি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই ধারা নতুন নয়
বাংলাদেশের প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সরকার প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে পুনরায় নিয়োগ দিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক আস্থার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। গত এক দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও একাধিক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও সচিবকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব
প্রশাসনের অভ্যন্তরে এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। এ কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন বিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে।
কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগের কারণে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়। প্রথমত, এতে পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সচিব করা হলে নিচের পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, এতে প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন চাকরি করেও শীর্ষ পদে ওঠার সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনের পেশাদার কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ অনেক সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা ছাড়াই কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কেন এই পদ্ধতিতে ভরসা
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তাই এমন কর্মকর্তাদের দায়িত্বে বসাতে চায়, যাদের ওপর তারা আস্থা রাখতে পারে। এই কারণে অনেক সময় অবসরপ্রাপ্ত বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এতে সরকারের কাছে একটি "বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো" তৈরি হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রশাসনের পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিঞা টিবিএসকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে আগের ধারাই বহাল রয়েছে।
তিনি বলেন, "ব্যতিক্রমী বা উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ লোককে কাজে লাগানোর জন্য জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এখন সরকারগুলো তাদের আস্থাভাজনদের দিয়ে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সুযোগ নিচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের নিয়মিত প্রথায় পরিণত হচ্ছে। স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে ভবিষ্যতে জনপ্রশাসনের কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সরকারের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতাও রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার প্রশাসনিক শূন্যতা পেয়েছে। দক্ষ ও যোগ্য লোক বাছাই করতে সরকারের কিছু সময় লাগবে। সে কারণে স্বল্পমেয়াদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে হয়তো।"
"তবে দলীয় বিবেচনা এবং কর্মরতদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়—এমন নিয়োগ কাম্য নয়। প্রশাসনকে গতিশীল করতে কর্মরতদের মধ্য থেকে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করে পদায়ন করতে হবে," যোগ করেন তিনি।
অন্যান্য দপ্তরে পদত্যাগ, চুক্তি বাতিল ও চুক্তিতে নিয়োগ হচ্ছে
জনপ্রশাসনের বাইরেও চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল করছে সরকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের চুক্তি বাতিল নিয়ে দেশে বেশ আলোচনা হয়েছে। এরপর সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। এক সপ্তাহ আগে পদত্যাগ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও পদত্যাগ করেছেন। আরও পদত্যাগ করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম ব্যাপারী।
প্রশাসনে রদবদলের অংশ হিসেবে ৯ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে একদিনে পাঁচ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
তারা হলেন—আবু হাসান মুহাম্মদ তারিক, আবদুল আলীম মাহমুদ, মাসুদুর রহমান ভূঞা, নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি কুসুম দেওয়ান এবং সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল তওফিক মাহবুব চৌধুরী।
রোববার জারি করা পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপনে তাদের সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
আবার এদিকে ১০ মার্চ দেড় দশক আগে পুলিশের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মো. কোহিনূর মিয়াকে অপসারণকালকে চাকরি হিসেবে ধরে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
