২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীদের ভাতা বৃদ্ধির অনুমোদন
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ১৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সংশোধিত ভাতা আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৯০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা এবং স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত ও নিগৃহীত নারীদের জন্য মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ প্রবীণ ও বিধবা ভোগীদের মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমের উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ বাড়িয়ে মোট ৬২ লাখে উন্নীত করা হবে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা এবং ৯০ বছর ঊর্ধ্ব ২ লাখ ৫ হাজার বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ১,০০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন।
এছাড়া ২৯ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতার মধ্যে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার জন মাসিক ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন এবং ৯০ বছর ঊর্ধ্ব ২৫ হাজার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মাসিক ১,০০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রমে ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধীর মধ্যে ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন মাসিক ৯০০ টাকা হারে এবং ১৮ হাজার ১০০ জন মাসিক ১,০০০ টাকা হারে প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধী এ ভাতা পাচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও মেধাবৃত্তির মাসিক হার ৫০ টাকা বাড়িয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তরে যথাক্রমে ৯৫০ টাকা, ১,০০০ টাকা, ১,১০০ টাকা এবং ১,৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমে উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ হাজার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাসিক ভাতার হার ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৯৮ জন বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩৩৮ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৃত্তি ও মেধাবৃত্তির মাসিক হার প্রাথমিক স্তরে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৮০০ টাকা, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ১,০০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১,২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ কর্মসূচির আওতায় মোট ৫ হাজার ৪৯০ জন অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সদস্যকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমে উপকারভোগীর সংখ্যা ৫ হাজার বাড়িয়ে ৬৫ হাজার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এককালীন চিকিৎসা সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় একজন মা মাসিক ৮৫০ টাকা হারে ভাতা পান।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ বাড়িয়ে ৬০ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতি পরিবার কেজি প্রতি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি করে মোট ছয় মাস খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকে।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মাসিক ভাতার হার ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।
সভায় ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন জেলেকে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে ১৫ লাখ জেলেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের মাসিক সম্মানি ভাতা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভিজিএফ কার্যক্রমকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
কৌশলগত সময় নিয়ে প্রশ্ন
সাধারণত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকার পরবর্তী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন সরকার গঠিত হবে, তারাই আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করবে। এ প্রেক্ষাপটে বাজেট ঘোষণার আগেই ১৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, 'যদিও আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন শুরু হয়েছে, তবু তারা পরবর্তী সরকারের জন্য একটি দিকনির্দেশনা রেখে যেতে পারতেন। বাজেটের আগেই উপকারভোগী ও ভাতার পরিমাণ প্রকাশ করাকে আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'এ বছর যেহেতু নির্বাচিত সরকার বাজেট প্রণয়ন করবে, তাই তারা তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও দলীয় নির্বাচনী অঙ্গীকার বিবেচনায় নিয়ে উপকারভোগী ও ভাতার হার নির্ধারণ করবে। সেখানে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ করে পরবর্তী সরকারের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।'
